)107111

10118,

51

01 1611 101১1), 11)%1101

এর

জুল ভের্ন ইন সার্চ অভ দ্য কাস্টআ্যাওয়েজ

অনুবাদ:

পি ঢ) ৮1

দেসজ পাবলিশিং || কলকাতা ৭০০ ০৭৩

7 924 0 2722 (0452 চ/বে 5 হা /৯৫1৬০১৪৪৫৪৪৪৩ ০%

07177: হা কবি

'1851210 0% 18281001012 132780900720185 25 20০55 হ৯510115181185 13 হ321855672 €51890052755 1০০1 (91089002700 073

প্রথম প্রকাশ : ১৯৬০ স্বত্ব : কৌশল্যা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রচ্ছদ : দেবব্রত ঘোষ

প্রকাশক : সুধাংশুশেখর দে | দে'জ পাবলিশিং ১৩ বক্ষিম চ্যাটার্জি স্টিটি কলকাতা ৭০০ ০৭৩

শব্দগ্রন্থছন : অব্রিজি কুমার | লেজার ইস্প্রেশন্স শগণেন্দ মিত্র লেন 1 কজকাতা ৭২০০ ০০৪

সুদ্রক : স্বপনকুমার দে 1 দেস্জা অফসেট ১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্টিট কলকাতা ৯০০ ০৭৩

অনুব/লিতকির উহ স্রশ্গর্ট

ওলা আবার্জি বুম

২৬9০৬ তভহত ভ7০্নান্কি) সদা?

কাণ্তেন নেমোকে নিয়ে তিনটি আশ্চর্য অভিযান লিখেছিলেন জুল ভের্ন _- যার দুটিতে কাণ্তেন নেমো সশরীরে দেখা দেন, কিন্তু মধ্যবর্তী যে- কাহিনী, ইন সার্চ অভ দ/ কাস্টআ্যাওয়েজ, সেটা পড়ে ফেলবার পর একবারও আমরা দেখা পাই না কান্তেন নেমোর - এমনকী বই শেষ করবার পরও এটা অব্দি জানি না কাণ্তেন নেমোর কাহিনীর সঙ্গে এর যোগ কোথায়, কেমন ক'রে কাণ্তেন নেমোর অশরীরী উপস্থিতি এই বইতেও আছে ? সেটা অবশ্য স্পষ্ট হবে পরে, জুল ভের্-এর কুহকের দ্বীপের কাহিনী মিস্টিরিয়াস আইল্যাণও পড়বার পরই।

কিন্তু কাপ্তেন নেমো সশরীরে এখানে দেখা দিন বা না-দিন, এই দুর্বার গতির অভিযান চলেছে ইওরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া _ তিন- তিন মহাদেশ জুড়ে, জলে-ডাঙায় কত বিপদ, কত রুদ্ধশ্বাস মুহূর্ত, কতবার শেষমুহূর্তে উদ্ধার_যখন মনে হচ্ছে উদ্ধারের কোনো আশাই নেই কোথাও, তখনই. আসছে চমক আর আছে রহস্যলিপি, মুশকিল আসানের তিন তলব, জল লেগে যে-রহস্যলিপির বেশির ভাগ শব্দই মুছে গিয়েছে, পঞ্ড়ে মানে বুঝতে গিয়ে হিমশিম খেয়ে যেতে হয়। আর এই উপন্যাসে জুল ভের্ন নিজেকে ঠাট্টা ক'রেই এক ভূগোলবিদের অধ্যাপক __ জাক পাঞয়ল, জুল ভেন্ন-এর €তরি-করা কাপ্তেন নেমো, ফিলিয়াস ফগ, মিখায়েল সুঁগফ, হবু বা ইম্পে বার্বিকেনের মতোই এক চরিত্র, খার সঙ্গে পরিচয় হবার পর যাঁকে ভুলে-যাওয়া কিছুতেই আর সম্ভব নয়। শেষ অনুচ্ছেদটিও বিস্ময়কর, কেননা সেখানেও জুল ভের্নণ আমাদের জন্যে রেখে গেছেন আরেকটা চমক

একবার এ-বই থেকেই তৈরি হয়েছিলো গানেভরা এক চলচ্চিত্র _যাতে জাক পাঞ্চয়লের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন মরিস শেভালিয়ে।

মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় অনূদিত জুল ভের্ন-এর অন্যান্য বই

শ্রোষ্গ গল আ্যড্বিফুট ইন দ্য প্যাসিফিক জার্নি টু দ্য সেন্টার অভ দি আর্থ ফ্রম দি আর্থ টু দ্য মুন পারচেজ অভ দ্য নর্থ পোল

ফাইভ উইক্‌স ইন বেলুন এর্লাউণ্ু দ্য ওয়াম্ড ইন এইটি ডেজ

ইন সার্চ অভ দ্য কাস্টআাওয়েজ

প্রথম

এক

হাঙরের পেটে এ-কোন লেখা

হাওয়া আসছিলো দক্ষিণপশ্চিম থেকে। সেই হাওয়া ঠেলে ভেসে চলেছিলো মন্ত-একটা প্রমোদতরী, উত্তর প্রণালী দিয়ে। মাস্তুলের ডগায় পৎপৎ ক'রে উড়ছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঝাণ্ডা, তার নিচে নীল বলয়ের ওপর সোনালি জরিতে লেখা 7.0. আর তাকে ঘিরে আছে বংশপ্রতাক. ছোটো-একটি মুকুট, কোনো আর্ল-এর পারিবারিক আভিজাত্যের চিহ্ন নিশ্চয়ই। বাস্পেচলা এই প্রমোদতরীটির নাম “ডানকান'। “ডানকান -এর মালিক লর্ড এডওয়ার্ড গ্রেনারভন হাউস অভ লর্ডস-এ যান বটে, দেশের ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান নিয়ে সেখানে কথাও বলেন, তবে তার রক্তের মধ্যে আছে নীল সমুদ্র নেশা : লালরজ্ত যতটা-না নীল, তার চাইতেও বেশি-নীল বোধহয় এই সমুদ্রের টানই। রয়্যাল টেমস ইয়ট ক্লাবের তিনি নামজাদা সদস্য-- কতবার যে তার বিলাসবহুল ইয়ট নিয়ে পাড়ি দিয়েছেন, বাজি লড়েছেন, তার ইয়ত্তা নেই। এবার কিন্তু নিছক দৌড়ের বাজি বা আডভেনচারের নেশায় তিনি তার এই মন্ত প্রমোদতরীাটি নিয়ে এই প্রণালীর জলে বেরিয়ে পড়েননি, এবার তিনি বেরিয়েছেন তার নবপরিণীতা পত্রী তরুণী লেডি হেলেনাকে নিয়ে, নিছকই শখের বেড়ানো সঙ্গে আছেন তার তুতোভাই মেজর মাকন্যাব্স। গোড়ায় যাবেন গ্রাসগো, তারপর বারদরিয়ায় প্রমোদত্রমণে।

জুলাই মাস শেষ হ'তে চলেছে, আজ ২৬ তারিখ, বছরটা ১৮৬৪, ভরা গ্রীন্ম। কিন্তু গ্রেটব্রিটেনে শ্রীঘ্মকাল সবসময়ে তো! ঠিক শ্রীষ্মকাল নয়, আবহাওয়ার মর্জি কারু বোঝাই দায়; হয়তো দিনের পর দিন সূর্যের দেখাই পাওয়া গেলো না, আকাশ ভরা রইলো নিচু, ভারি মেঘে, কালো বা ধূসর; বৃষ্টি পড়লো টিপটিপ বা ঝমঝম; হাওয়া গর্জালো তারই সাথে পাল্লা দিয়ে, উত্তুরে হাওয়া, কনকনে-ঠাগ্ডা। অতএব শ্রীষ্মকালেও ঠাণ্ডা এড়াবার জন্যে প'রে থাকো জবড়জং ভারি পশমি পোশাক ; শুধু-যে কনকনে ঠাণ্ডা তা-ই নয়, তারই সঙ্গে অসহ্য হয়ে ওঠে দিনরাত্তির এই ভেজা-ভেজা ভাবটা মনে হয় হাড়গোড়ও এই বর্ষার হাওয়ায় শ্যাওলা গজিয়ে জ'মে যাচ্ছে। এবার কিন্তু গ্রীষ্মের চালটা একটু অন্যরকম। বেশ ঝকঝকে রোদ্দুর ছিলো গত কয়েক সপ্তাহ, আকাশ ছিলো

নীল, আর অবহাওয়া ছিলো মোলায়েম। সেইজন্যেই হঠাৎ মাথায় এসেছিলো নতুন-বিয়ে- করা স্ত্রীকে নিয়ে সমুদ্রে কোথাও বেরিয়ে পড়লে কেমন হয়। এরপর আবহাওয়া যদি দুম ক'রে ঝোড়ো হ'য়ে ওঠে, তাহলেও অবশ্যি ভাবনা নেই--ডানকান চলে বাষ্পের জোরে, মাস্তুলের পাল হাওয়ার কৃপা পাবে ব'লে হা-পিত্যেশ ক'রে ব'সে থাকে না; বিলাসের সমস্ত আধুনিক উপকরণ আছে জাহাজে, বাড়ির আরামের চাইতে কোনোদিক থেকেই কম নয়। আর বাড়িতে থেকেই বা করতেন কী? ক্লাব, পার্টি, নাচের মজলিশ, সাম্রাজ্যের কোথায় কী অঘটন ঘটছে সে নিয়ে আলোচনা আর তর্কাতর্কি, আর নয়তো কখনও-কখনও কোথাও পিকনিকে বেরিয়ে-পড়া: একঘেয়ে কাটছিলো ব্জীবন, উত্তেজনাহীন, অলস, নিস্তরঙ্গ। বরং সমুদ্র সবসময়েই চঞ্চল--সবসময়েই বিষম তাড়া ক'রে কোথাও চলেছে, আর ঢেউয়েরা রহস্যময় কোন-এক ভাষায় অস্ফুট স্বরে সারাক্ষণই কী কথা শুনিয়ে চলেছে। জাহাজ মানে হ'লো “চলস্তের মধ্যে আরেক চলস্ত'- কোথায় যেন এ-রকম একটা কথা একবার শুনেছিলেন লর্ড এডওয়ার্ড। “চলো কোথাও,- সমুদ্রেরও তো এটাই সুর। কাজেই চলো, বেরিয়ে-পড়া যাক।

তাছাড়াও আরো-একটা উদ্দেশ্য ছিলো বৈকি লর্ড এডওয়ার্ডের। তারই নিরেশি- মাফিক, তারই নকশা অনুযায়ী, সদ্য কারখানা থেকে বেরিয়ে এসেছে ডানকান, তার নবপরিণীতা স্ত্রীকে এটাই তার বিশেষ উপহার। কিন্তু এই ঝকঝকে জাহাজটি নিয়ে যদি বারদরিয়ায় পাড়ি জমিয়ে পরথ ক'রেই দেখা না-গেলো তবে বুঝবেন কী ক'রে ডানকান কেমন জাহাজ-কেমন মজবূত আর কাজের। অন্তত মহড়া দেবার জন্যও একবার ধেরুতে হয় বৈ কি। আর এইজন্যেই তরতর ক'রে ডানকান এখন চলেছে প্রণালীর জলে-.আগে হ'লে বলা যেতো মন্ত-এক রাজহাস যেন অনায়াসে সাবলীলভাবে চলেছে; এখন অবশ্য এই কলের জাহাজ, যার চোও থেকে গলগল ক'রে ধোঁয়া বেরুচ্ছে, তাকে একটা নতুন-কোনো প্রাণীর কথা ভেবে নিতে হয়, কিন্তু মোদ্দা কথাটা মানতেই হয় : ডানকানের চলবার.ভঙ্গি ছন্দোময়, সাবলীল, অনায়াস-.এমন সহজ-স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে পুরোনো পালের জাহাজ সচরাচর যেতে পারতো না! লর্ড এডওয়ার্ড ভারি খুশি ডানকান জাহাজের চলবার ভঙ্গি দেখে। কাপ্তেন জন ম্যাঙ্গল্‌সও এই জাহাজের ভার পেয়ে খুব খুশি। সপ্তসিদ্ধু দশদিশন্ত তিনি চ'ষে বেরিয়েছেন জাহাজে-জাহাজে, অনেক ভালো 'জাহাজেও কাজ করেছেন আগে, তবে এই ডানকান জাহাজের সঙ্গে সেগুলোর কোনো তুলনাই হয় না।

লর্ড এডওয়ার্ড রক্তের মধ্যে চাঞ্চল্য বোধ করছিলেন ব'লে নিজেই স্ত্রীকে নিয়ে জাহাল্মে এসে উঠেছেন। তখনও তিনি ঘৃণাক্ষরেও জানতে পারেননি তার এই ছটফল্টে অস্বস্থিটায় আসলে আরো-কোনো বড়ো অভিযানেরই পূর্ববোধ ছিলো- সত্যি-বলতে

কোনো অভিযানের কথাই তিনি ভাবেননি, শুধু একটু বেড়ানো সমুদ্রে, আর নতুন জাহাজটার কেরামতি হাতে-কলমে বা জলে ভাসিয়ে পরখ ক'রে দেখা-এই ছিলো তার উদ্দেশ্য।

বেশ-খানিকটা পথ অনায়াসেই চলে এসেছে ডানকান-কোনো অস্বস্তি বা অস্বাচ্ছন্দ্য বোঝা যায়নি, একটুক্ষণের মধ্যেই গতি দ্রুত ক'রে ফেলতে পারে এই কলের জাহাজ, আবার ইচ্ছে করলে তাকে মস্থরও ক'রে আনতে পারে ;-তাকে বাতাতসর গতি বা জলের উচ্ছ্বাস-কোনোকিছুর ওপরই নির্ভর করতে হয় না। মাঝি-মাল্লারাও এই নতুন জাহাজটা হাতে পেয়ে উৎসাহভরে কাজে লেগেছে। সত্যি-বলতে, কেউ যদি একবার নাবিক হয়, রক্তে যদি একবার সমুদ্বের নেশা ঢুকে যায়, তাহ'লে ডাঙায় আর কিছুতেই তার মন ওঠে না-এই মাঝিমাল্লারাও ডাঙায় বসে কবে ডানকান জলে ভাসবে তারই প্রতীক্ষায় ছটফট করছিলো। এখন তারা এই আনকোরা মজবুত জাহাজটা হাতে পেয়ে ভারি খুশি। |

আজকের দিনটা ভারি চমৎকার। ঝকঝকে মুচমুচে রোদ্দুর, আকাশ ঘন-নীল, শুধু অনেক ওপরে ধূসর শাদা মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছে, সমুদ্রের সবুজ জলেও বাড়তি কোনো ঢেউ বা ছটফটানি নেই : ডানকান জাহাজ তার এই ট্ীয়াল রানে চমৎকার চলেছে।

সেইজন্যই একটু বাদে যখন দূরে জলের ওপর একটা ক্ষুদ্ধ আলোড়ন দেখা গেলো তখন লর্ড এডওয়ার্ড বেশ অবাকই হ'য়ে গেলেন-মনে হ'লো সমুদ্রের জল তোলপাড় ক'রে কী-একটা যেন ওদিকটায় এক ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধিয়ে বসেছে। কাণ্তেন ম্যাঙ্গলস নিশ্চয়ই বলতে পারবেন ব্যাপারটা কী-এঁ আজব, অতিকায় জলস্তস্ে্ই বা কী কারণ। দুরবিনে চোখ লাগিয়ে মনে হচ্ছে কোনো মাছ--কিন্তু হঠাৎ এই সময়ে স্কটল্যাণ্ডের সমুদ্রে কোথাকার অতিকায় মাছ?

লর্ড এডওয়ার্ডের প্রশ্নের উত্তরে কাণ্তেন মাঙ্গল্স দুরবিনে চোখ এঁটেই ব'লে উঠলেন : “এ তো হাঙরেরই এক জাতভাই !,

“হাঙর!” লর্ড এডওয়ার্ড বিস্মিত। “এখানকার সমুদ্রে হাঙর আছে নাকি ?'

প্রায়ই আসে। অবশা কোনো সাধারণ জাতের খুদে হাঙর নয়-.বরং সাধারণ হাঙরের চাইতে একে আলাদাই দেখায়। যদি অনুমতি করেন তো লেডি হেলেনাকে আমরা হাঙর কী ক'রে ধরে তারই একটা নমুনা দেখিয়ে দিই। মাছটা সত্যি বড়ো, তাছাড়া স্বতাবটাও বেয়াড়া। জেলেদের ছোটো নৌকোগুলোর ওপর উৎপাত করতে পারে--ফলে একে নির্মূল করাই ভালো।'

“তাহ'লে তা-ই 'করো। এ-বিষয়ে তুমি যা বলবে তা-ই হবে

লর্ড এডওয়ার্ড গিয়ে লেডি হেলেনাকে ডেকের ওপর ডেকে নিয়ে এলেন।

বঝকরে রোদ্দুর আর সমুদ্রও প্রধানত শান্তই-তাই এই অতিকায় হাঙরটার

দাপাদাপি স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে।

কাণ্তেন ম্যাঙ্গলসের হুকুমে মাল্লারা সাজো-সাজো ভঙ্গিতে লড়াইয়ের প্রাথমিক প্রশ্তুতিটা সেরে ফেললে। মন্ত-একটা আংটায়_-তাকে বড়শি বলাই ভালো, যেমন অতিকায় মাছ তেমনি অতিকায় বঁড়শি- মাংসের টুকরো গেঁথে মাল্লারা জলে ফেলে দিলে। আংটটা শক্ত কাছিতে বাঁধা, অনেকটাই বড়ো, দরকার হ'লে দড়ি ছেড়ে দিয়ে জলের মধ্যে হাঙউরটাকে খেলানো যাবে। কাপ্তেন ম্যাঙ্গল্স অবিশ্যি নিছক মাছধরা দেখাবেন বলেই এটাকে ধরবার উদ্যোগ নেননি। এত-বড়ো মাছটা ধরতে পারলে অনেকটা তেল পাওয়া যাবে। হাঙরের তেল তো সবসময়েই কাজে লাগে। ওষুধ হিশেবে তো বটেই, তবে দরকার হ'লে এই চর্বিতে অন্য কাজও করা যাবে।

অনেকটা দূর থেকেই মাংসের গন্ধটা পেয়েছিলো মাছটা, কিংবা তার দৃষ্টিও ঘ্বাণশক্তির মতোই প্রখর ছিলো। তীরের মতো ছুটে এলো সে, যেন ছো মেরে পড়বে। জলের ওপর দেখা ঘাচ্ছে প্রচণ্ড গতিতে তার কালো পাখনাটা ছুটে আসছে, ডগাটা ছাইয়ের মতো ধূসর। কাছে এলে চোখে পড়লো তার মস্ত দুটি ভাটার মতো চোখ, রাক্ষুসে খিদেয় মুখটা হা-করা, সারি-সারি দাত দেখা যাচ্ছে। প্রকাণ্ড মাথাটাকে দেখাচ্ছে অতিকায় কোনো হাতুড়ির মতো। এর পাখনার ঝাপ্ট, জোয়ালের জাতিকল কিংবা মুগুরের মতো মাথাটার ঘা- কোনোটাই সাধারণ ছোটো জেলেডিঙির পক্ষে মনোরম হ'তো না। কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্সই ঠিক বলেছেন | এ-জীবকে বাচিয়ে রাখতে নেই।

কাছে এসেই মাছটা একটা গৌঁত্তা খেয়ে ছোঁ মেরে পড়লো মাংসের টোপটার ওপর, আর সে মাংসের টুকরোটা গিলতেই মাল্লারা হঠাৎ একটা হ্াচকা টান দিলে আর অমনি আংটাটা তার গলায় আটকে গেলো। তারপর শুরু হ'লো দড়ি টানাটানির খেলা অতজন মাল্লা মিলে কাছিটাকে ধ'রে টান দিচ্ছে, হাঙউরটা গলায় বড়শি বিধে যাওয়াতে ছটফটও করছে, কিন্তু তাই ব'লে মোটেই জল ছেড়ে ওঠবার লক্ষণ দেখাচ্ছে না। ও-রকম অস্থিরভাবে দাপাচ্ছে দেখে তার ঝটপটি কমাবার জন্যে পাখনার ওপর দিয়ে একটা দড়ির ফাসও পরিয়ে দেয়া হলো তাকে। তারপর আধঘন্টা ধূন্ধুমার কাগুডর পর তাকে তোলা হলো ডেকে, মাল্লাদের একজন তক্ষুনি একটা কুঠারের কোপে তার পুচ্ছটাকে আলগা ক'রে দিলে। কিন্তু তার আগেই দেখা হ"য়ে গেছে দুই পাখনা, লম্বা পুচ্ছ, ফোলা পেট, লম্বা শরীর, মুণ্ডতরের মতো মাথা--সব মিলিয়ে প্রকৃতিঠাকরুন কী-একটা অদ্ভুত কারখানা সৃষ্টি করেছেন। সে যখন ছোটে জলের মধ্যে তখন তার এঁ পাখনা আর পুচ্ছই তাকে গতি- বা লক্ষ্য- ভুষ্ট হ'তে দেয় না। হাওরটার ল্যাজে যে-কোপ দেয়৷ হয়েছিলো তার কারণ অতর্কিতে সে যাতে ল্যাজটা দিয়ে একটা মরণঝাপট দিতে না-পারে। লেডি হেলেনা কিন্তু এই ভয়ানক রক্তক্ষয়ী দৃশ্যটা দেখে কেমন আতকে উঠেছিলেন, তিনি চটপট তার ক্যাবিনে ফিরে গেলেন। এই রক্তারক্তি কাণ্ডটার জন্যে তিনি তার মনোরম প্রমোদভ্রমণের

অভিজ্ঞতাটাকে মাটি ক'রে দিতে চান না।

অনেক প্রাণী আছে, মাংসাশী বটে, তবে খিদে না-থাকলে অন্য প্রাণীকে স্তাক্রমণ করে না। হাঙররা মোটেই তা নয়, তারা ঝাক বেঁধে থাকে, সবাই মিলে একসঙ্গে ঝাপিয়ে পড়ে শিকারের ওপর, মুহূর্তে সব সাবাড় ক'রে দেয়। কুকুরমাছের জাতের এই মাছটা দলছাড়া হ'য়ে পড়েছিলো--সে কি একাই তার রাক্ষুসে খিদেটাকে নিবৃত্ত করবার জন্যে ? সে অবশ্য একাই একশো।

মাল্লারা সাধারণত হাঙর ধরলেই পেট চিরে দেখে নেয় কী-কী সে গলাধঃকরণ করেছে ম'রে যাবার আগে। পুচ্ছহীন হ'লেও তার দাপাদাপি তখনও আদৌ তুচ্ছ নয়। সে তখনও ফৌস-ফৌস ক'রে নিশ্বেস নিচ্ছে আর ছটফট করছে। লম্বায় সে দশফুটের ওপর, ওজনটাও কোন-না ছশো-সাড়ে ছশো পাউগু। মাল্লারা কয়েকজন মিলে তার ওপর ঝাপিয়ে পড়লো, কিন্ত্ব প্রথমেই পেট চিরে দেখা গেলো পেট খালি, পেটের মধ্যে কিচ্ছু নেই। মাংসের টুকরেটার গন্ধ পেয়েই সে-যে অমনভাবে ধেয়ে এসেছিলো তা সম্ভবত খিদেয় এমন হন্যে হ'য়ে ছিলো ব'লেই। কেটে সেটাকে টুকরো-টুকরো ক'রে ফেললে মাল্লারা, চবিটা সরিয়ে রেখে এই জলরাক্ষসের দেহাবশেষ জলে ফেলতে গিয়েও মাল্লারা থমকে গেলো, কেননা তাদের মধ্যে একজন তখন চেঁচিয়ে উঠেছে, 'আরে ! ওটা কি আটকে আছে পাকস্থলিতে ?

“হবে কোনো নুড়িপাথর ! যা রাক্ষুসে খাই-খাই, খিদের জ্বালায় হয়তো তা-ই খেয়ে ফেলেছে।' বললে আরেকজন।

টম অস্টিন_সে এই ডানকান জাহাজের ফার্টমেট-বললে, 'ধুর আহাদ্মক ! দেখছিস না ছিলো পাঁড়মাতাল। ওটা নুড়িপাথর নয় মোটেই। আমি তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি একটা বোতল !'

এই শোরগোল শুনে লর্ড এডওয়ার্ড এগিয়ে এসেছিলেন কাছে। অবাক হ'য়ে বললেন : “বোতল ! হাঙরের পেটে বোতল ! এমন কথা তো কস্মিন্কালেও শুনিনি যে হাঙর বোতলশুদ্ধু মদ খেয়ে ফ্যালে ! বোতলটা বার করো পেট থেকে ! অনেক সময় লোকে দরকারি কাগজপত্র পুরে ছিপি এঁটে সমুদ্রে বোতল ভাসিয়ে দেয়। এটা হয়তো সে-রকমই কিছু কই, নিয়ে এসো ওটা।

হাঙরের পেট থেকে বোতলটা বার ক'রে নিয়ে আসা হ'লো। তাকে ধুয়েটুয়ে সাফসুতরো ক'রে বোতলটা রাখা হলো টেবিলে। লর্ড এডওয়ার্ড, মেজর ম্যাকন্যাব্ঁ, কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স--এদের উত্তেজিত কথাবার্তা শুনে লেডি হেলেনাও কৌতুহলী হ'য়ে পাশে এসে দীড়ালেন।

লর্ড এডওয়ার্ড বোতলটা হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে আগাপাশতলা সেটা নিরীক্ষণ করলেন।

পাশ থেকে উকি মেরে দেখে মেজর ম্যাকন্যাব্স বললেন, “হুম! শ্যাম্পেনের বোতল 1” তিনি সেটা জানতেই পারেন, সামরিক ব্যারাকে অস্ত্রশস্ত্র, কুচকাওয়াজের সঙ্গে- সঙ্গে 'নানাবিধ পানীয়রও চর্চা হয়ে থাকে।

“কীসের বোতল জেনে আর কী হবে» লেডি হেলেনা উদ্শ্রীব হ'য়ে বললেন, “হঠাৎ হাঙরের "পেটে কোথেকে এলো, সেটাই জানতে চাই।,

“অনেকদিন নিশ্চয়ই জলে ভেসেছিলো। কী-রকম শ্যাওলা পড়েছে ওপরটায় দেখেছো ?” লর্ড এডওয়ার্ড বললেন, “হাউরটার পেটে হয়তো খুব বেশিদিন যায়নি।,

ছিপিটা খুলতে শিয়ে দেখা গেলো এতদিন জলে থাকার ফল ফলেছে--ভেতরটায় জল ঢুকে গিয়েছে।

“বিচ্ছিরি কাণ্ড হ'লো তো! ভেতরে জল ঢুকেছে দেখছি। তাহ'লে কি আর ভেতরে যা ছিলো তা আর অটুটু থাকবে?

বোতলের ছিপিটা খোলবার পর একটা বিশ্রী আশটে গন্ধে আশপাশ ঝিমঝিম ক'রে উঠলো।

ভেতরে কিন্তু সত্যি-কিছু আছে। কাগজ? সে-রকমই তো দেখাচ্ছে। কিন্তু ভেতরে সেটা আটকে গিয়েছে-সম্ভবত জলে ভিজে গিয়েই।

“বোতলটা ভেঙে ফেললেই তো হয় ?' মেজর ম্যাকন্যাব্স অমনি সমাধানটা বাৎলে দিলেন।

“তার চাইতে বরং বোতলের মাথাটাই ভাঙা যাক, কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্সের সুপরামর্শ। “তাহ'লে হয়তো ভেতরের জিনিশটা নষ্ট হবে না।'

হাতুড়ি ঠুকে বোতলের মাথাটা ভাঙা হ'লো। ঝনঝন ক'রে চারপাশে ছড়িয়ে পড়লো ভাঙা কাচ। সন্তর্পণে কাচের টুকরো ছাড়িয়ে নিয়ে ভেতর থেকে তিন-তিনটে পার্চমেন্ট বার ক'রে এনে বিছিয়ে রাখা হ'লো টান-টান ক'রে।

দেখা গেলো, তিনটে পার্চমেন্টেই জল লেগে লেখা প্রায় ঝাপসা হ"য়ে এসেছে। অনেকক্ষণ ধ'রে আলোর সামনে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখলেন লর্ড এডওয়ার্ড। কী লেখা আছে এগুলোয় ?

দুই একে তিন তিনে এক

ভালো ক'রে দেখে নিয়ে লড এডওয়ার্ড বললেন, “এ-যে দেখছি তিন-তিনটে আলাদা দলিল। একেকটা একেক ভাষায় লেখা এটা আলেমান, এটা ইংরেজি-আর এইটে ফরাশিতে লেখা

“কী লেখা আছে ? পাঠোদ্ধার করা যায়?” লেডি হেলেনা কৌতুহলী হ'য়ে জিগেস করলেন।

“উহু। সব কথা পড়া যাচ্ছে না যে। কিছু-কিছু লেখা জলে মুছে গিয়েছে যে।

“তিনটে দলিলে যদি একই কথা তিন ভাষায় লেখা হ'য়ে থাকে, তাহ'লে হয়তো তিনটে একসঙ্গে মিলিয়ে পসড়ে দেখলে একটা মর্মোদ্ধার করা যাবে।

হ্যা, ঠিক বলেছো। আচ্ছা, প্রথমে ইংরেজিটা দেখা যাক।,

ইংরেজিতে লেখা বলছি তা থেকে শুধু এটুকুই পাঠোদ্ধার করা যাচ্ছে :

বেশ-খানিকক্ষণ লেখাটা প'ড়ে মর্মেদ্ধার করার ব্যর্থচেষ্টা ক'রে হতাশ হ'য়ে মেজর ম্যাকন্যাব্স মন্তব্য করলেন, “উহু, কিছুই তো বোঝা যাচ্ছে না। একটা বাক্যও আস্ত নেই _-কিছু বোঝা যাবে কী ক'রে?

“কোনো গেটা বাক্য না-থাকলেও কতগুলো শব্দ তো আন্ত আছে এই-যে, দ্যাখো না, 5111. 81017, [7115, 010 105 এই শব্দগুলো কিন্তু ঠিকই আছে। আর 910 নিশ্চয়ই 51109 কথাটারই গোড়ার দিক। 01-এটার 0 বড়োহাতের হরফ ব'লে মনে হয়, কোনোকিছুর নাম। 9101190 যদি আমরা ঠিকঠাক ভেবে থাকি, তবে এই 01 হয়তো জাহাজটারই নাম--আর 5515(91709 কথাটা থেকে মনে হয় সাহায্য চাচ্ছে। সম্ভবত 0ো জাহাজটা ডুবে গেছে, বা এমনভাবে ভেঙে গিয়েছে যে আর নাব্যতার উপযোগী নেই সেই জন্যেই এই 8551518706 চাইবার প্রার্থনা ।,

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স বললেন, “55151870০টা যে 8551518109এরই শেষাংশ সেটা আপনি ঠিকই ধরেছেন। 00০17 কথাটা সেভাবেই নিশ্চয়ই 9০৫10! কথাটার গোড়ার দিক-_শেষটা মুছে গিয়েছে

“হয়তো এই অনুমানগুলো ঠিক, তবে যেহেতু অনেকগুলো লাইন নেই, কোনো বাক্যই নেই পুরোপুরি, তাতে আসল ব্যাপারটাই জানা যাচ্ছে না। যদি জাহাজড়ুবির পর কেউ সাহায্য চেয়ে এই দলিলটা বোতলে পুরে জলে ভাসিয়ে দিয়ে থাকে, ধ'রে নিলুম তা-ই হয়েছে, কিন্তু এই তথাগুলো নেই জাহাজটার নাম কী, কোথায় যাচ্ছিলো ; কোন দেশের জাহাজ (কারণ বাকিগুলো তো ইংরেজিতে লেখা নয়--আলেমান আর ফরাশিতে) তাও বোঝা যাচ্ছে না। কবে কোথায় গিয়ে জাহাজটা বিপাকে পড়েছে তারও কোনো হদিশ নেই। আমরা যা জানতে পাচ্ছি, তার অনেকটাই অনুমানের ওপর নির্ভর ক'রে-' মেজর ম্যাকন্যাব্স জানালেন।

দু-নম্বর পার্চমেন্টটার গায়ের লেখা প্রথমটার চাইতে আরো অবোধ্য-প্রায় পুরোটাই নষ্ট হ'য়ে গেছে। পার্চমেন্টে যা পড়া গেলো, তা এই :

_ “ৎস্ভাই, আট্রোসেন, ব্রিংগ্ট ইরেন- * কান্তেন ম্যাঙ্গল্স কথাগুলো জোরে-জোরে উচ্চারণ করলেন। “আলেমান ভাষা, বললেন তিনি, “তাছাড়া হরফগুলো গথিক। সিবেন ১০

ইউনি অর্থাৎ সাত জুন। ইংরেজি কাগজটার 62 যদি তারিখেরই অংশ হয় তাহ'লে এই দুটো জুড়ে পাওয়া যাচ্ছে সাত জুন, ১৮৬২। আলেমান দলিলে আছে 01855, ইংরেজিতে আছে 0০৬%--জুড়ে দিলে হবে 0185520/, অর্থাৎ জাহাজটা ছিলো গ্লাসগোর। পরের একটা লাইন কিছুই পড়া যাচ্ছে না--শুধু ঝাপসা কালির দাগ। কিন্তু তারপরেই রয়েছে ৎস্ভাই-৪2/০1-- মানে দুই, মাঝে ফাক দেখে মনে হয় ৪009501এর আগে অন্তত একটা হরফ ছিলো--যদি 718100567 হয় তবে বোঝাবে নাবিক, মাঝিমাল্লা। 8১ কথাটার মানে ঠিক ধরতে পারছি না। কিন্তু অন্য দুটো কথা তো আন্তই আছে টা) 110 মানে 01718 01০1-ওদের নিয়ে এসো; এখন 55158109 বা 2551510709এর সঙ্গে যদি জোড়া যায় তাহলে দীড়াবে 0111) 106], 0551500100- মানে ওদের কাছে সাহায্য নিয়ে এসো। ওদের সাহায্য করো।,

লর্ড এডওয়ার্ড বললেন : “সাহায্য চাইছে ? কারা?

মেজর ম্যাকন্যবস বললেন : উই রনির হত রা আমরা জানি না।'

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স তৃতীয় পার্চমেন্টটা নেড়ে-চেড়ে বললেন : “কী ধরনের সহায়তা পাঠাতে হবে, তা সম্ভবত পরের লেখাটায় চোখ বুলিয়ে নিলেই বোঝা যাবে। যেহেতু ফরাশিতে লেখা, কারুপক্ষেই বুঝতে অসুবিধে হবে না)

“ত্রোয়া-1/015-মানে তো তিন, আর 118১ সেটা সম্ভবত মাস্তুলই বোঝাচ্ছে __তিন মান্তুলের জাহাজ লর্ড এডওয়ার্ড হঠাৎ উত্তেজিত হ'য়ে উঠলেন। "ইংরেজি আর ফরাশি লেখা মিলিয়ে তো জাহাজটার নামও পাওয়া যাচ্ছে-ব্রিটানিয়া_-87112771121 অর্থাৎ গ্রেটব্রিটেনের জাহাজ ! আর 44570! ইংরেজিতেও যা বোঝাচ্ছে ফরাশিতেও তা- ই--অর্থা দক্ষিণ গোলার্ধের কথা-_

৯১

কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্‌্স বললেন : “তার মানে, দক্ষিণ গোলার্ধে জাহাজডুবি হয়েছে!

কথাগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করতে-করতে লর্ড এডওয়ার্ড আরো-কতগুলো ব্যাপার আন্দাজ ক'রে নিলেন। শব্দের ভাঙাচোরা টুকরো থেকেই অনুমান ক'রে নিতে হবে গোটা শব্দটা-এবং কোনো নৌযাত্রার সঙ্গেই যেন সে-সব শব্দের একটা সংগতি থাকে আর এই সৃত্রটা ধ'রেই সশব্দে অনুমান দাড় করালেন লর্ড এডওয়ার্ড : ৪৮০7 ধ'রে নিলুম 2০7০7 এর প্রথম অংশ মানে জমিতে নামা যাত্রীরা ডাঙায় নেমেছে। কিন্তু কোথায়? 0০/1%--তা নিশ্চয়ই 00171017017!ই বোঝাচ্ছে-কোনো-একটা মহাদেশ-"

“দক্ষিণ গোলার্ধের মহাদেশ ?” মেজর ম্যাকন্যাব্স তার অনুমানের টিল ছুঁড়লেন।

“এটা খেয়াল করেছেন?” কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স ব'লে উঠলেন, “7৮ শব্দটা থেকে আলেমান শব্দ 2/2%$-এরও একটা আচ পাওয়া যাচ্ছে-278459/7- অর্থাৎ 271/50716 _ভয়ংকর-নিষ্টর।'

51741 তাহ'লে কি 17717-_-ভারতবর্ধ ? আর ০2 বা কী-আরে ! সেটা নিশ্চয়ই 1০)211%44এরই ধবংসাবশেষ- দ্রাঘিমা। তাহ'লে 17 হ'লো অক্ষরেখা, 1917%72--৩৭ ডিগ্রি ১১। তাতে তো ঠিকানাটাই পেয়ে-যাওয়া গেলো, অন্তত তার একটা মোটামুটি আন্দাজ ।'

'দ্রাঘিমা কত না-জানলে আর মোটামুটি ঠিকানা তুমি পেলে কোথায়? মেজর ম্যাক্ন্যাব্স ফ্যাকড়া তুললেন।

“আগে তো তিনটের বয়ান মিলিয়ে সবটা লিখে ফেলা যাক- একসঙ্গে চোখের সামনে যদ্দি থাকে, তাহ'লে হয়তো হেয়ালিটার একটা নিষ্পত্তি হবে_' বললেম লর্ড এডওয়ার্ড।

“যারা এই পার্চমেন্টগুলো ঝেঙলে পুরেছিলো, তারা কিন্তু কোনো ধাঁধা বা হেয়ালি তৈরি করতে চায়নি--তারা ঠিকঠাক জানাতে চেয়েছিলো কোথায় কী হয়েছে। শুধু প্রকৃতির কপাতেই খানিকটা লেখা মুছে গিয়ে জট পাকিয়ে গেছে ।" কাণ্ডেন ম্যাঙ্গলস বললেন।

*“সেইজন্যেই একসঙ্গে সাজিয়ে নিলে সুবিধে হবে। তাছাড়া লেখাগুলো সব পশ্চিম ইওরোপের নানা ভাষায়--আর আমরা যদি জাহাজের নামটা সঠিক অনুমান ক'রে থাকতে পারি, ব্রিটানিয়া, তাহ'লে সেটা মোটেই অস্বাভাবিক হয়েছে বলেও মনে হয় না। এবার সবগুলো লেখা একসঙ্গে মিলিয়ে দেখা যাক তা থেকে জটটা খোলবার কোনো হদিশ মেলে কি না।'

তিনটে পার্চমেন্টের লেখাকেই সাজিয়ে নিয়ে ইংরেজিতে লিখে ফেললেন লর্ড এডওয়ার্ড

৯৯

30176 711) 1862 15802 13111211012 19520৬/

৮/01)0 ৫0৮1) -_£01016 81131121-_ 1)% 10170 [৮/0 59011015

(0101911) 01-- 107

€০011011-- [0 0106] 11001-- (100৬1 11015 [09101 17 10178110006

81018111000 37911" 18165 07০]) 7611)

10৩1

লেখাটা যখন তারা খতিয়ে দেখছেন, তখন মাল্লাদের একজন এসে জানতে চাইলে এবার ডানকান জাহাজ কোন্দিকে যাবে। পুরোটাই তো এই আনকোরা জাহাজটার মহড়া চলেছে, এমনিতে তার বিশেষ-কোনো নিদিষ্ট গন্তব্ই নেই। এবার অবশ্য ঠিক ক'রে নেয়া দরকার ডানকান ফিরে যাবে কি না।

প্রশ্ন শুনে লর্ড এডওয়ার্ড বললেন : “ডামবার্টন চলো। লেডি হেলেনা ম্যালকম কাস্ল-এ ফিরে যাবেন। আমি তারপর যাবো লগ্ডনে- নৌবাহিনীর দফতরে গিয়ে এটা দেখাতে হবে। তাছাড়া ব্রিটানিয়া সম্বন্ধেও খোঁজ-খবর নিতে হবে আমাদের ।,

মাল্লাটি নির্দেশ নিয়ে চলে গেলে লর্ড এডওয়ার্ড লেখাটা তুলে নিয়ে বললেন : “আমরা তাহ'লে ধরে নিতে পারি যে ১৮৬২ সালের ৭ই জুন একটা ত্রিমাস্তল যুদ্ধজাহাজ --ব্রিটানিয়া-গ্লাসগো থেকে বেরিয়েছিলো--সেটা কোনো অজ্ঞাত কারণে ডুবে গিয়েছে। কাপ্তেন আর তার সঙ্গে দুজন মাল্লা ৩৭০১১ অক্ষাংশ থেকে তিনটি ভাষায় খবরটা জানিয়ে সাহায্যের প্রার্থনা ক'রে একটা বোতলে লেখাগুলো পুরে জলে ভাসিয়ে দিয়েছে। এর মধ্যে যদি তারা উদ্ধার না-পেয়ে থাকে, তাহ'লে দু-বছরেরও বেশি হ'লো কোথাও পড়ে আছে--'

'যদি-না এর মধ্যে ম'রে গিয়ে থাকে, বললেন মেজর ম্যাক্ন্যাব্স।

“আর যদি বেঁচেও থাকে, তাদের দশা এখন কী হয়েছে, সেটা খানিকটা কল্পনা ক'রে নেয়া যায়, এতক্ষণে লেডি হেলেনা মুখ খুললেন।

“খুব-একটা ভালো অবস্থায় নেই সম্ভবত, লর্ড এডওয়ার্ডকে একটু উদ্ধিগ্নই দেখালো। “কিন্তু একটা মুশকিল হয়েছে, তার সমাধান কী, আমার মাথায় আসছে না। জাহাজটা ডুবেছে সম্ভবত দক্ষিণ গোলার্ধের কোথাও। কিন্তু & 80716 শব্দটার মানে কী” হ'তে পারে?

“ওটা তো ফরাশি লেখাটার টুকরো--ফরাশি ভাষায় যাকে চ81880716 বলে, ইংরেজিতে তাকেই বলে 798801181 এটা সেই পাতাগোনিয়া কথাটারই ভগ্নাংশ নয় ভো?'

১৯৩

'পাতাগোনিয়া কি ৩৭০ অক্ষরেখায় পড়ে?" মেজর ম্যাকন্যাব্স জিগেস করলেন।

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স তক্ষুনি আমেরিকার দক্ষিণভাগের মানচিত্র খুলে দেখিয়ে দিলেন সত্যি তা-ই।

“দক্ষিণ আমেরিকা যদি হয় তাহ'লে ধাধার জট আরো-খানিকটা খোলা যায়। 0017017- তাহ'লে 007017910, [0-হ'তে পারে 171507015, আর 0101 1701 সেক্ষেত্রে হ'তে পারে 0186] [701075| আর এই অনুমান যদি ঠিক হয় তাহ'লে তারা হয়তো নিষ্ঠুর ইগ্ডিয়ানদের হাতে বন্দী হয়েছে। এবং সেক্ষেত্রে তারা এখনও বেচে আছে কি না, সে-সম্বদ্ধে সংশয়ও জাগতে পারে।

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স বললেন : “পাতাগোনিয়া দক্ষিণ আর্হেনতিনা আর দক্ষিণ চিলের মধ্যে অবস্থিত--তার একদিকে আন্দেয়াস গিরিমালা অন্যদিকে আ্যাটলান্টিক মহাসাগর। তিয়ের্রা দেল ফুয়েগো এই পাতাগোনিয়ারই অংশ।'

“যদি আর্হেনতিনা বা চিলের দক্ষিণভাগেই তা হ'য়ে থাকে, তবে এটা আশ্চর্য যে অন্যান্য ইওরোগীয় ভাষার সঙ্গে এস্পানিওলে কিছু লেখা নেই। তাছাড়া আর্হেনতিনার পাম্পায় বা চিলেয় যে-ইগিডয়ানরা থাকে, তারাই বা কতটা নিষ্টুর? অকারণে কাউকে বন্দী ক'রে রেখে তারা কি অত্যাচার করবে? লেডি হেলেনা প্রশ্ন তুললেন।

'এ-সব তো আমাদের অনুমান মাত্র,” লর্ড এডওয়ার্ড বললেন, 'গ্লাসগো গিয়ে না- হয় খোঁজ ক'রে দেখা যাবে ব্রিটানিয়া সত্যি-সত্যি কোথায় যাচ্ছিলো সেখানে নিশ্চয়ই কোনো নথিপত্রে কিছু লেখা থাকবে।

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স বললেন তার কাছে নৌদফতরের গেজেট আছে--সেখানে হয়তো এক্ষুনি কোনো হদিশ পাওয়া যেতে পারে। দু-বছর আগেকার গেজেট বার ক'রেই একটা জরুরি তথ্য বার ক'রে নেয়া গেলো।

“এখানে গেজেটে একটা জ্ঞাপনী আছে। ১৮৬২ সালের ৩০শে মে কাণ্তেন গ্রান্ট কাইয়াও থেকে ব্রিটানিয়া জাহাজ নিয়ে গ্লাসগোর উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।'

“কাইয়াও ? সে আবার কোথায়?” মেজর ম্যাকন্যাব্স জিগেস করলেন।

“কাইয়াও, গেজেট থেকে মুখ তুলে কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স জানালেন, “পশ্চিম পেরুর একটা নগর-বন্দর-লিমার পশ্চিমে, কাইয়াও উপসাগরের তীরে অবস্থিত। তেমন- ছোটো শহরও নয়-দেড় লাখের ওপর লোক আছে-_,

লর্ড এডওয়ার্ড কিন্তু কাইয়াওয়ের খবর শুনছিলেন না। তিনি বরং ব্রিটানিয়া জাহাজের কাণ্তেনের নাম শুনে চমকে উঠেছেন। “ফাণ্ডেন গ্রান্ট? সেই যিনি প্রশাস্ত মহাসাগরে নোভাস্কোশিয়ার পত্তন করতে চেয়েছিলেন-_নয়াস্কটল্যাণ্ড?

“হ্যা। তিনিই। কিন্তু ১৮৬২ সালে ব্রিটানিয়া জাহাজ নিয়ে তিনি কোথায় যে নিরুদ্দেশ

৯৪.

হ'য়ে গেছেন তা আজও কেউ জানতে পারেনি

“তাহ'লে তো আমরা অনেকটাই জেনে যেতে পেরোছ। ৩০শে মে তান কাইয়াও থেকে বেরিয়েছিলেন--৭ই জুন অর্থাৎ ঠিক আটদিন পরে পাতাগোনিয়ার কাছে কোথাও _হয়তো উপকূলেই--জাহাজডুবি হয়। এবার তাহ'লে দ্রাঘিমাটা জেনে যেতে পারলেই আমরা বুঝে যাবো সত্যি-কোথায় তার জাহাজডুবি হয়েছিলো।,

“দ্রাঘিমা যদি নাও জানা যায়, কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স জানালেন, “পাতাগোনিয়া বা তিয়েররা দেল ফুয়েগো আমার জানা! আমরা সেখানটায় অনায়াসেই পৌছে যেতে পারবো।,

“এবার তাহ'লে গোটা সন্দেশটা লিখে ফেলা যাক» লর্ড এডওয়ার্ড বললেন, “অন্তত যে-কথাগুলো সম্বন্ধে আমাদের আর-কোনো সন্দেহই নেই, সেগুলো পর-পর সাজিয়ে দেখা যাক কী দাঁড়ায়।

১৮৬২ খিষ্টাব্দের জুন মাসের সাত তারিখে গ্লাসগোর ত্রিমান্তল যুদ্ধজাহাজ. ব্িটানিয়া দক্ষিণ গোলার্ধে পাতাগোনিয়ার কাছে কোথাও ডুবে গিয়েছে। দুজন মাল্লা আর কাণ্তেন রা বা নামবার' চেষ্টা _তাদের বলা হয়েছে ভয়ংকর অথবা নি্ঠুর_নামবার সময় ৩৭০১ ১১ অক্ষরেখায় তারা সাহায্য চেয়ে একটা বোতলে নানা ভাষায় খুঁটিনাটি জানিয়ে তিনটে চিরকুট ভাসিয়ে দিয়েছিলেন-অন্তত আর-কোনো বোতলে এই বার্তা জানিয়েছিলেন কি না জানা নেই: -তবে এটায় তার! তিনটি ভাষায় আবেদন জানিয়েছিলেন-যাতে যারই হাতে পড়ুক সে-ই মূল আবেদনটা পড়তে পেরে সাহায্য পাঠাতে পারে।

এই মর্মার্ঘটা জানবার পর সকলেরই মত হ'লো যে, বাপারটা বাস্তবিকই নিশ্চয়ই তা-ই হয়েছিলো।

লেডি হেলেনা কাণ্ডেন ম্যাঙ্গল্সকে জিগেস করলেন : “তারপর থেকে আজ অব্দি আদৌ কোনো খোঁজ মেলেনি তাদের ?

কাণ্তেন ম্যাঙ্গল্স মাথা নেড়ে জানালেন, “না।'

কিন্তু এই চিরকুটগুলো দেখালে কি সরকার থেকে কোনো সাহায্য পাওয়া যাবে না? ব্রিটানিয়া তো একটা যুদ্ধজাহাজ, ফ্রিগেট-তাতে কামানও তো আছে !

লেডি হেলেনা বললেন, 'আর কাণ্তেন গ্রান্টের পরিবার? তাঁর স্ত্রী বা ছেলে- 'ময়ে_,

লর্ড এডওয়ার্ড বললেন, 'এ নিয়ে তুমি মিথ্যে আর ভেবো না। আমিই তাদের ধবর .দেবো। দরকার হ'লে তাদের দায়িত্ব নেবো।'

একটু প্রে ডানকান যখন ডামবারটনের বন্দরে ভিড়লো, লেডি হেলেনাকে নিয়ে

এপস্য ০০০ উরস

মেজর ম্যাকন্যাব্স গেলেন ম্যালকম কাসল-এর উদ্দেশে, আর লর্ড এডওয়ার্ড লগ্ডনের ট্রেন ধরবার আগে টাইমূস আর মনি ক্রুনিকল কাগজ দুটোয় একটা বিজ্ঞাপনের খশড়া পাঠিয়ে দিলেন ছাপবার জন্যে : নিচের ঠিকানায় লর্ড এডওয়ার্ড গ্রেনারভনের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।- ম্যালকম কাসূল, ডামবারটন, স্কটল্যাও।

তিন কাণ্তেন গ্রান্টের ছেলেমেয়ে

পশ্চিম স্কটল্যাণ্ডের লখ ফাইন-এর কাছে, যেখানে সমুদ্র থেকে একটা লম্বা ল্যাজ যেন দু-দিকে ডাঙা রেখে ভেতরে ঢুকে পড়েছে, তারই কাছে একটা টিলার ওপর তৈরি হয়েছে ম্যালকম কাস্ল, মস্ত-একটা দুর্গ, পুরোনো সমস্ত কিংবদ্তি কুয়াশা আর আলোছায়ায় ছাওয়া পরিখাঘেরা কেল্লা, তাকে জড়িয়ে কত-যে গল্প আছে তার ঠিক নেই। সেই কবে থেকেই গ্লেনারভনরা এই কেল্লার মালিক, কত যুদ্ধ-বিগ্রহ চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র কল্পকথা কিংবা প্রেমকাহিনীর সে সাক্ষী--ফার্গাস ম্যাকগ্রেগর বা তারই মতো কেউ-কেউ সে-সব কাহিনীর নায়ক। স্কটল্যাণ্ডে যখন তুলকালাম কাণ্ড চলছিলো, বিদ্রোহ রিক্ষোভ স্বাধীনতার লড়াই, তখন আযংলো-স্যাকসনদের অত্যাচারে কত-যে স্কট দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলো, তার ইয়ত্তা নেই, যদিও গ্লেনারভনরা শাণাঙ।বে টিকে থাকতে চেয়েছেন এখানে এবং টিকেও গিয়েছেন, আর তাদেরই সঙ্গে থেকে গিয়েছে-টিকেই গিয়েছে বলা যায়--তাদের কিছু অনুচর সহচর--বংশানুক্রমিকভাবে তাদের পরিবাররাও সুখে-দুঃখে বিপদে-আপদে গ্নেনারভনদের সঙ্গে ছিলো। ইংরেজদের অধীনতা মেনে নিতে হয়েছে ব'লে তাদের দুঃখের শেষ নেই। কিন্তু তারই মধ্যে তারা জিইয়ে রাখতে চেয়েছে তাদের স্বাতন্ত্র্য, তাদের সংস্কৃতি-কিল্ট পরে তারা, খাটো হাটু অব্দি নামা ছোটো স্কার্ট, কিংবা বলে গেলিকভাষা, কিংবা বাজায় ব্যাগপাইপ, ফ্লুট, হাইল্যাণ্ডের সংগীত। তারা না-থাকলে একা-একা গ্লেনারভনদের এই কেন্লায় থাকা মুশকিলের হ'তো, যতই কেননা ম্যালকম কাস্ল মজবুত হোক, কিংবা কাস্ল হোক সশস্ত্র, থাকুক জালিকাটা উপরদেয়াল, যেখান থেকে গোলন্দাজদের বন্দুকের নল বেরিয়ে থাকতে পারে হানাদারদের উদ্দেশে। এরা সবাই নিভীক, দুঃসাহসী, বেপরোয়া-আর বিশ্বস্ত অনুগত। সত্যি-বলতে, তারাই আছে

১৬.

ডানকান জাহাজে, ওস্তাদ মাল্লা একেকজন, দুর্ধর্ষ, সমুদ্ধ যখন রাগে ফৌসে, গর্জায়, একটুও না-টস্কে, একটুও বিচলিত না-হ'য়ে, মাথা ঠাণ্ডা রেখে তারা জাহাজ সামলাতে পারে। স্কটল্যাণ্ডের উপকূলে সমুদ্র প্রায়ই অশাস্ত হ'য়ে ওঠে, বিশেষত দীর্ঘস্থায়ী বর্ষায়, আর ছেলেবেলা থেকেই সেই জলে বেরোয় ব'লে তারা জানে কেমন ক'রে শামাল দিতে হয় সে-সময়।। তারা শুধু নির্ভরযোগ্য বা নিছক বেপরোয়াই নয়, তাদের দুর্দা্ত দুঃসাহস এসেছে তাদের অভিজ্ঞতা থেকে, দক্ষতা থেকে, একেকজন তারা ওস্তাদ মাঝি- মাল্লা, চৌকশ, দুর্ধর্ধ।

লর্ড এডওয়ার্ড গ্লেনারভন অজন্ত্র বিস্তসম্পদের মালিক--কিস্তু এই বিপুল অর্থ তিনি কোনো মক্ষিচুষ কঞ্জুসের মতো শুধু সিন্দুকেই তুলে রাখেন না, অকাতরে সে-অর্থ তিনি সে-অঞ্চলের মানুষদের অবস্থা ফেরাবার জন্যে বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যয় করেন, দরকার হ'লে হাউস অভ লর্ডস-এ তাদের জন্যে বাগ্যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, লড়াই করেন, তাদের উন্নতির জন্যে নিপুণভাবে যুক্তি সাজিয়ে শানিয়ে ভাষণ দেন-_ সেইসব ভাষণে কেবল যে বুদ্ধির মারপ্যাচ থাকে, কুটজাল থাকে যুক্তির, তা-ই নয়--কখনও-কখনও সেইসব কথার সঙ্গে মিশে যায় তীব্র আবেগ--অর্থাৎ নীরক্ত, শীতল, হৃদয়হীন বুদ্ধির প্যাচই খেলেন না লর্ড এডওয়ার্ড--এ-দেশের মানুষের জন্য সত্যি ভাবেন তিনি, তাদের কথা ভাবেন সবসময়, আর এই দেশপ্রেম বা দেশবাসীর জন্যে প্রেম আছে ব'লেই অকুতোভয়ে এমন- সব পরিকল্পনা ফাদতে পারেন, যে-সব কাজে নামতে গিয়ে অনেক ডাকাবুকো লোকও দু-একবার ইতস্তত করবে। বিপদের সম্ভাবনা দেখে তিনি তার প্রস্তাবিত পরিকল্পনা থেকে পেছিয়ে আসেন না। তিনি রয়্যাল টেমস ইয়ট ক্লাবে নাম লিখিয়েছেন, তা নিছক খেয়ালি বিস্তবান বলেই নন। এটা ঠিক যে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় নামতে তার ভালোই লাগে, উত্তেজনা জাগে মনে, রক্তে জাগে চাঞ্চল্য, শিহরন। কিস্তু আরো-একটা উদ্দেশ্য থাকে আড়ালে-- প্রতিযোগিতায় তিনি কেবল ব্যক্তি হিশেবেই জেতেন না, জেতেন স্ষটল্যাণ্ডের প্রতিনিধি হিশেবে, স্বদেশের নাম উজ্জ্বল করবার জন্যে। কিন্তু তার এই দেশপ্রেম তাই ব'লে তাকে সংকীর্ণ মানুষ ক'রে তোলেনি--তার চিত্তের ওঁদার্যও তাকে অন্যদের চাইতে ভিন্ন ক'রে দিয়েছিলো-বিশেষত হাউস অভ লর্ডসে অন্য যে-সব ধনীর দুলাল অহংম্মন্যতায় বা আত্মকেন্দ্রিকতায় তিনি ঠিক তাদের মতো নন। এজন্যে তার বিস্তর সুনাম হয়েছিলো আর তা যে কারু-কারু মধ্যে ঈর্ধার ছৃলুনি জাগিয়ে দিতো না, তাও নয়। কিন্তু ব্রিশবছর বয়সী এই সুপুরুষ ককৃখনো নিজে থেকে কাকে তার বির্ধাচরণ করবার সুযোগ দেননি-- প্রতিযোগিতা হয় জলে, ইয়টের বাজিতে, আর এই প্রতিদ্বস্িতার জের থাকে ততক্ষণই যতক্ষণ জলেয় মধ্যে চলে এই রেষায়েবি। সাধারণ মানুষের প্রতি তার দরদ এতই সহজে তার স্বভাবটার সঙ্গেই মানিয়ে যেতো যে তাতে কখনও ফোনো

ইন সার্ট: ২.

আত্মস্তুরিতা প্রকাশ পেতো না। আর তার দরাজ দিলের সঙ্গে সংগতি রেখেই ছিলো তার প্রচণ্ড দুঃসাহস। এটা এমন ধরনের কোনো দুঃসাহস নয় যার মধ্যে দেখানেপনা আছে, শুধু দুঃসাহসী কীর্তি ক'রেই যা তুষ্ট হ'তো, অর্থাৎ নিছক বেপরোয়াভাব প্রকাশ করার জন্যেই তিনি বেপরোয়া কাজেকর্মে ঝাপিয়ে পড়তেন না, তার পেছনে তাগিদ থাকতো পরের উপকার করবার। আর এই পরোপকার-প্রবৃত্তি কারু কৃতজ্ঞতার প্রত্যাশী ছিলো না, বরং কারু জন্যে কোনো কাজ ক'রে দেবার পর সে যদি গদগদ হ'য়ে তাকে সম্ভাষণ.করতো তবে তিনি যেন লজ্জাই পেয়ে যেতেন, একটু সংকুচিত বোধ করতেন, আড়ুষ্ট। তিনি যদি অকাতরে দেশের মানুষের জন্যে সর্বস্ব বিলিয়ে দিতেন, অন্তত বিলিয়ে দেবার প্রয়োজন এলে তিনি যে তাতে পেছ-পা হতেন না এটা সুনিশ্চিতই ছিলো, তবু তিনি ঠিক চাইতেন না লোকে সেটা জানুক, জেনে তাকে বাহবা দিক, শাবাশি জানাক -_-পারলে নিজেই তিনি প্রসঙ্গটা হয়তো ভুলেই যেতেন। .. এহেন লর্ড এডওয়ার্ড বিয়ে করেছেন হেলেনাকে, সাধারণ ঘরের মেয়ে। সুশিক্ষিতা, বুদ্ধিমতী, সংবেদনশীল, কিন্তু তার ধমনীতে নীল রক্ত বয়ে যেতো না। অন্যান্য অনেক রূপসী তরুণী-অভিজাতঘরের মেয়ে সবাই--তার প্রেমে পড়বার জন্যে যেন তৈরি হ'য়েই ছিলো। তাদের সঙ্গে লর্ড এডওয়ার্ডের নানা উপলক্ষে মেলামেশাও হ'তো, নাচের উইলিয়াম টাফনেলের এই মেয়েকে-সেই অকুতোভয় টাফনেল, যিনি ছিলেন বিখ্যাত ভ্রমণবিদ, কত-যে দেশবিদেশ ঘুরে বেড়িয়ে এসেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। হেলেনার সঙ্গে যখন লর্ড এডওয়ার্ডের পরিচয় হ'লো টাফনেল পরিবার তখন বিষম দারিদ্রের মধ্যে দিন কাটাচ্ছিলো। হেলেনার বয়েস তখন সদ্য বাইশ ছুঁয়েছে। বিত্ত, কিংবা নীল রক্ত, কিংবা তথাকথিত জাগতিক খ্যাতি কিছু না-ই থাক, হেলেনার রূপগুণ ছাড়া আরো-একটা জিনিশ ছিলো, যা লর্ড এডওয়ার্ডের প্রণয়প্রার্থী অন্য মেয়েদের ছিলো না-আর তাতেই যেন সবাইকে টেক্কা দিয়ে গিয়েছিলেন লেডি হেলেনা, আর সেটা এই : তিনি স্কটল্যাণ্ডের দুহিতা। হেলেনা যে.স্কটিশ, এটাই ছিলো লর্ড এডওয়ার্ডের কাছে একটা বাড়তি আকর্ষণ। অবশ্য স্কটিশ না-হ'লেও হেলেনাকে তিনি বিয়ে করতেন ব'লেই মনে হয়--কেননা প্রথম পরিচয়ের মুহুর্তেই দুজনে দুজনের প্রতি অত্যন্ত আকৃষ্ট হয়েছিলেন, কিন্তু হেলেনা যে স্কটল্যাণ্ডের দুহিতা-এই তথ্যটা কাটান দিয়েছিলো এই সামাজিক রীতিকে--যে, অভিজাতরাই অভিজাতকে বিয়ে করবেন। লর্ড এডওয়ার্ডের কাছে স্কটল্যাণ্ডের মানুষ মাত্রেই অডিজাত। আর হেলেনা টাফনেল তো বিশেষ ক'রে তা-ই, যেহেতু দুজনের মনের মিল এতটাই হয়েছিলো যে সত্যি-বলতে কোনো সামাঙ্জিক রীতিনীতির অযৌক্তিক বিধানকেই নির্বিগরে, বিনাতর্কে মানতে দেয়মি।

বিয়ের পর হেলেনাকে তাক লাগিয়ে দেবেন ব'লে লর্ড এডওয়ার্ড একটা বাল্পেচলা

১৮

জাহাজ তৈরি করাচ্ছিলেন। লোকে মধুচন্দ্রিকা যাপন করতে যায় নিশ্চিন্ত নিরুপদ্রব কোনো ভূম্বর্গে; লর্ড এডওয়ার্ডের ধারণা ছিলো অন্যরকম। তারা বেরিয়ে পড়বেন সমুদ্রে, মধূচন্দ্রিকার সঙ্গে মিশবে প্রমোদভ্রমণ, অর্থাৎ কোথাও গিয়ে আস্তানা গেড়ে বসা নয় _ সারাক্ষণই চলতে থাকবেন দুজনে, রোজ নতুন জলে সূর্যোদয় বাঁ সূর্যাস্ত দেখবেন _অথচ জাহাজটি এমনভাবে তৈরি করা হবে যাতে সমস্ত সুখস্থাচ্ছন্দ্য থাকে, আরামবিরামের অবকাশ থাকে। সত্যি-বলতে, কোনো ইয়ট ক্লাবের সদস্য মিথ্যে কেন মধুচন্দ্রিকা যাপন করবে ডাঙায়?

আর এই কারণেই তৈরি করা হয়েছিলো ডানকান। জাহাজের নীল-খশড়া--অর্থাৎ নকশাটা-অনেক ভাবনাচিস্তার পর লর্ড এডওয়ার্ডের মাথা থেকেই বেরিয়েছিলো। একই সঙ্গে মজবৃত হবে, সর্বাধুনিক এনজিন থাকবে তার, তরতর ক'রে জল কেটে এগিয়ে যাবে, কিন্তু তাতে থাকবে আরামেরও সব উপকরণ, যাতে কিছুতেই এ-কথা কখনও মনে না-হয় যে এর চাইতে কোনো ভালো হোটেলে গিয়ে উঠলেই হ'তো।

আর তারপরে নতুন-তৈরি জাহাজ ডানকানকে নিয়ে মহড়ায় বেরুবামাত্র আকনম্মিকভাবে পাওয়া গেলো মুশকিল আসানের তিন তলব--তিন-তিনটে ভাষায় লেখা সাহায্যের প্রার্থনা।

লর্ড এডওয়ার্ড টাইমস আর মনি ভ্রুনিকলে বিজ্ঞাপন দুটো পাঠিয়ে দিয়েই রওনা হয়ে গেলেন লগুনের উদ্দেশে, নৌদফতরে শিয়ে তিনি বিশদ জানাবেন কী হয়েছে, সেইসঙ্গে খোঁজ-খবরও নেবেন কাণ্তেন গ্রান্টের ব্রিটানিয়া সম্বন্ধে। আর লেডি হেলেনা চ'লে এলেন ম্যালকম কাস্ল-এ।

পরদিনই লগ্ুন থেকে এক তার এসে হাজির। যত-শিগগির-সম্ভব লর্ড এডওয়ার্ড ডামবারটন ফিরে আসবেন; কিন্তু তারের পেছন-পেছন সেদিনই রাত্তিরে এলো এক চিঠি। তার সংক্ষিপ্ত বয়ানের ততোধিক সংক্ষিপ্ত সারমর্ম-লগুন থেকে ফিরতে দেরি হবে। নববিবাহিত বর তার কনেকে খুবই সোজাসুজি জানিয়েছে তাড়াতাড়ি ফেরা সম্ভব হবে না। চিঠিটার ষয়ানের ধরন দেখে লেডি হেলেনার একটু ভাবনাই হ'লো। যেন তাড়াহুড়ো ক'রে হঠাৎ লর্ড এডওয়ার্ড কোনো কারণে মতি পরিবর্তন ক'রে জানাচ্ছেন লগ্নে তার সময় লাগবে। কেন? হঠাৎ আবার কী হ'লো?

এ-চিঠি পাবার পর লেডি হেলেনা যখন সাত-সতেরো অনেককিছুই ভাবছেন অথচ + কোনো হদিশই পাচ্ছেন না লর্ড এডওয়ার্ডের আকম্মিক সুচিবদল করার কারণের, এমন সময়ে তার খাশ পরিচারক এসে জানালে অনেক দূর থেকে ট্রেনে ক'রে দুই কিশোর- কিশোরী এসেছে, লর্ড গ্নেনারভনের সঙ্গে এক্ষুনি দেখা করতে চায়, জরুরি দরফার। তাদের নাফ বিষম বিচলিত দেখাচ্ছে

কারা ঞারা-.লেডি হেলেনা ঠিক বুঝতে পারলেন না। লর্ড এডওয়ার্ডের তাড়াতাড়ি

১৯

না-ফেরার সঙ্গে এদের কোনে যোগ আছে? থাকুক বা' না-থাকুক, তাদের খুব বিচলিত দেখাচ্ছে এ-কথ! শুনেই লেডি হেলেন তাদের ডেকে পাঠালেন।

ঘরে যারা ঢুকলো, সত্যি তাদের বয়েস বেশি নয়। মেয়েটির বয়েস ষোলো-সতেরো হবে, সে-ই দূজনের মধ্যে বড়ো, পোশাক-আশাক দেখে বোঝা যায় এককালে যদি-বা অবস্থাপন্ন ঘরের মানুষ হয়েও থাকে এখন নিশ্চয়ই অবস্থাবিপাকে পড়েছে, কেননা পোশাক তার দামি, তাতে রুচির ছাপ আছে, পরিচ্ছন্নও, কিন্তু দেখে বোঝা যায় এই পোশাক পুরোনো, বহু ব্যবহারে তার রঙ একটু মিইয়ে এসেছে ছিপছিপে সুশ্রী কিশোরী, ডাগর দুটি চোখ--লাল, ফোলা-ফোলা, দেখে মনে হয় এতক্ষণ কাদছিলো। ছেলেটির বয়েস বারো-তেরো, তারও পরনে দামি কিন্তু পুরোনো পোশাক-_ দুজনেরই মুখের আদলে মিল আছে, সম্ভবত এরা ভাই-বোন। একটু উদভ্রান্তই দেখাচ্ছে দুজনকে, উত্তেজিতও | তারা লর্ড এডওয়ার্ডের সঙ্গে দেখা করতে চায়, খবরকাগজে বিজ্ঞাপন পণড়ে ছুটে এসেছে, কাণ্ডেন গ্রান্টের খোজ নিতে চায় তারা৷

. “কান্তেন গ্রান্টের খোজ? তাদের উত্তেজিত অধীর চোখমুখ দেখে জিগেস করলেন লেডি হেলেনা : “কেন, বলো তো? কে তোমরা?

“কাণ্তেন গ্রান্টের ছেলেমেয়ে ।'

কাণ্ডেন গ্রান্টের ছেলেমেয়ে

“হ্যা।” মেয়েটি প্রায় যেন ফিশফিশ ক'রে কথাটা বললে, “আমার নাম মেরি, আর আমার ভাই, রবার্ট

রবার্ট বললে, “আমরা টাইমস-এ একটা বিজ্ঞাপন দেখেছি-কেউ যদি ত্রিমাস্তুল মানোয়ারি জাহাজ ব্রিটানিয়ার কোনো খোঁজ নিতে চায় তাহ'লে যেন এখানে এসে হিজ লর্ডশিপের সঙ্গে দেখা করে। কিন্তু এসে শুনি তিনি এখানে নেই, লগ্ন গেছেন। অথচ বিজ্ঞাপনে ব্রিটানিয়া জাহাজের নাম দেখে আমাদের আর তর সয়নি-'

“আমরা আগে থেকে চিঠি লিখে দেখা করবার জন্যে কোনো সময় ঠিক ক'রে আসিনি, হিজ লর্ডশিপ তো আর জানতেন না আমরা আসবো--' মেরি বললে, “কিন্তু বাবার জাহাজের নাম দেখেই আমাদের এমন অস্থির লাগলো যে আমরা কোনো নিয়মকানুনের ধার না-ধ'রেই ছুটে এসেছি--'

লেডি হেলেনা তাদের আশ্বস্ত করলেন। 'না-না, সেজন্যে ভেবো না। আসলে লর্ড গ্লেনারভন ব্রিটানিয়া সম্বন্ধে কথা বলতেই লগুনে নৌবাহিনীর সদর দফতরে শেছেন।' তারপর লেডি হেলেনা তাদের এক-এক ক'রে খুলে বললেন কেমন ক'রে হাঙরের পেটে বোতলটা পাওয়া গেছে, আর বোতলের ভেতরে তিনটে ছোট্ট পার্চমেন্ট -তাতেই ব্রিটানিয়ার খবর ছিলো। “লর্ড গ্লেনারভন কালকেই ফিরে আসবেন। তোমরা বরং এখানেই থেকে যাও--কোনো কর্মালিটি নেই--কাল লর্ড এডওয়ার্ড ফিরে এলেই

২০

তোমাদের সঙ্গে কথা হবে-লগুনে তিনি কী জানতে পারবেন, তা আমিও জানি না, তাই আমিও তার ফেরার জন্যে অপেক্ষা ক'রে আছি।'

লর্ড এডওয়ার্ডকে ম্যালকম কাস্ল-এ না-পেয়ে ভাইবোনে যেন একটু মুপসেই গিয়েছিলো। লেডি হেলেনার সদয় ব্যবহারে তারা রীতিমতো মুগ্ধ হ'য়ে গেলো। তারা রাতটা কেন্লাতেই কাটাতে রাজি হ'লো। বিশেষ ক'রে লেডি হেলেনা যখন বললেন যে তিনি কাণ্তেন গ্রান্ট সম্বন্ধে বিশেষ-কিছুই জানেন না, ভালোই হ'লো, এই ফাকে তাদের কাছ থেকে তার সম্বন্ধে সব জরুরি কথা জেনে নিতে পারবেন। তিনি অবশ্য সব কথা খুলে বলেননি তাদের কাছে, ব্রিটানিয়া যে জলে ডুবে গিয়েছে, কাণ্তেন গ্রান্ট যে বিদেশ- বিভুয়ে ইণ্ডিয়ানদের হাতে বন্দী হয়েছেন_.এ-সব কথা ব'লে তিনি ভাইবোনকে ঘাবড়ে দিতে চাননি।

সত্যি-বলতে রবার্ট আর মেরি বাবার কথা বলবার জন্যে যেন উদগ্রীব হয়েই ছিলো। যেন তাদের দুঃখের কাহিনী শুনিয়ে তারা মনের বোঝা হালকা ক'রে নেবার সুযোগ পেয়েই বর্তে গিয়েছে একটু বিশ্রামের পর, খাবার-টোবলে ব'সে ভাইবোনে তাকে কাণ্তেন গ্রান্টের কথা শোনালে।

বেচারারা! বাবার কথা বলতে-বলতে তাদের যেন চোখ ফেটে জল বেরুচ্ছিলো। ছেলেবেলাতেই তারা মাকে হারিয়েছিলো। তারপর তাদের হারাতে হ'লো বাবাকেও।

কাণ্তেন গ্রান্ট ডাকাবুকো বেপরোয়া মান্ষ। কিন্তু নিছক দুর্দান্ত আআডভেনচারে বেরুনোই নয়, তার চোখে ছিলো স্বাধীন স্কটলাগ্ডর স্বপ্ন স্কটল্যাণ্ড যদি স্বাধীন না-ই হয়, অন্তত সে যদি কোথাও উপনিবেশ স্থাপন করতে পারে, তাহলেও হয়। সেই স্বপ্ন ছিলো ব'লেই একদিন তিনি নিজের সব স্্গল দিয়ে মানোয়ারি জাহাজ তরিটানিয়া নিয়ে প্রশান্ত মহাসাগরে বেরিয়ে পড়েছিলেন- কোনো নতুন স্বীণ খুজে বাব ক'রে সেখানে একটা উপনিবেশ স্থাপন করবার জন্য ছেলেমেয়েকে রেখে শিযেছিলেন এক আত্তীয়ার কাছে -ইচ্ছে ছিলো, নতুন দ্বীপে বসবাসের ব্যবস্থা ক'রে ফিরে এসে একদিন তাদের সঙ্গে নিয়ে আবার পাড়ি জমাবেন। কিন্তু একদিন খবর এলো, ব্রিটানিয়া জাহাজের কোনো খবরই পাওয়া যাচ্ছে না।-_হয় সে-জাহাজ ডুবে গিয়েছে, নয়তো এমন-কোনো দুর্বিপাকে পড়েছে যা মৃত্যুরই শামিল--কিংবা হয়তো পড়েছেন মৃত্যুর চেয়েও ভয়ংকর কোনো পরিস্থিতিতে! মেরির বয়েস তখন মাত্র চোদ্দ, রবাঠ আরো ছোটো। এমন সময় সেই বৃদ্ধা আত্মীয়াও মারা গেলেন। তারপর থেকে ছোটোভাইটিকে সে সমস্ত দুঃখকষ্টের মধ আগলে রেখেছে, তাকে সান্ত্বনা দিয়েছে, তাকে মানুষ ক'রে তৃলতে চেয়েছে। দু-বছর ধ'রে কাণ্তেন গ্রান্টের কোনো খোঁজ না-পেয়ে সে ধ'রেই নিয়েছিলো যে বাবা মারা গেছেন। এখন, কাগজে বিজ্ঞাপনটা প”ড়েই তার মধ্যে এক নতুন আশা জেগে উঠেছে। একমুহূর্তও দেরি না-কা'ে ছুটে এসেছে লর্ড গ্রেনারভনের কাছে। বাবা তাহ'লে মারা

২১

যাননি-.নিশ্চয়ই বেচে আছেন।

লেডি হেলেনা অবিশ্যি তাদের কাছে নিজের আশঙ্কার কথা খুলে বললেন না। প্রথমত, দু-বছর আগে সাহায্য চেয়ে এই বোতল জলে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিলো কাণ্তেন গ্রান্ট যদি তখন দক্ষিণ আমেরিকার কোথাও ইগ্ডিয়ানদের হাতে বন্দী হ'য়ে থাকেন, তাহ'লে এখনও বেচে আছেন কি না কে জানে! তাছাড়া তারা তো এটা ঠিক ক'রে জানেন না কাণ্তেন গ্রান্ট সত্যি-বলতে কোথায় বন্দী হয়ে আছেন। অক্ষরেখা দ্রাঘিমারেখার মধ্যে একটা তারা জানেন, দ্রাঘিমারেখা যে কী, সেটার জন্যে তাদেরও তো অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াতে হবে। তাছাড়া লর্ড এডওয়ার্ডের ফিরে আসতে দেরি দেখে এটাই ভয় হয় যে নৌদফতর ব্যাপারটাকে কোনো পাত্তাই দেয়নি। তারা হয়তো কোনো সাহায্যই করতে ঢাইবে না।

ভাইবোনকে শুতে পাঠিয়ে দিয়ে লেডি হেলেনা মেজর ম্যাকন্যাব্সের সঙ্গে ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনায় বসেছিলেন। মেজর ম্যাকন্যাব্সের মনে হচ্ছিলো লেডি হেলেনার আশঙ্কা হয়তো অমূলক নয়_নৌদফতর হয়তো হারানো জাহাজের সন্ধানে কাউকেই পাঠাতে রাজি হবে না। কিন্তু মেরির দৃঢ়তায় তিনি প্রায় মুগ্ধই হ'য়ে গেলেন। এইটুকু মেয়ে একটুও ভেঙে পড়েনি-সব দুর্বিপাকের মধ্যেও ছোটোভাইটির দেখাশুনো ক'রে এসেছে। এটা মানতেই হয় যে মনের জোর আছে মেয়েটির। তবে সবসময়ে তো আর শুধু মনের জোরে হয় না, পরিস্থিতি যদি প্রতিকূল হয় তাহ'লে মনের জোর তখন হয়তো ভেঙে পড়তে দেয় না-_শুধু প্রতীক্ষা করতে বলে কখন পরিস্থিতি অনুকূল হবে। এতদিন মেরি ধ'রে নিয়েছিলো যে তার বাবা বেচে নেই, সে নিজেই এক মনের জোরে সব দুর্বিপাকের মধ্যে ছোটোভাইটির দেখাশুনো করার দায়িত্ব পালন করছিলো। এখন সে বিজ্ঞাপন দেখে আশা ক'রে ছুটে এসেছিলো, এমনকী আজ লর্ড এডওয়ার্ডের সঙ্গে দেখা না-হ'লেও এই আশা আছে যে কাল দেখা হবেই, কাল বাঝর সব খবর জানতে পাবে-অথচ লর্ড এডওয়ার্ড সম্ভবত লগ্ন থেকে কোনো আশার খবর নিয়েই ফিরবেন না। মেজর ম্যাকন্যাবসের সঙ্গে এই নিয়েই কথা বলছিলেন লেডি হেলেনা, ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না এই অবস্থায় কী তার করণীয়। তবে এটা অনুমান করতে দেরি হয় না যে যতদিন রবার্ট আর মেরি মেনে নিয়েছিলো যে কাণ্তেন গ্রান্টের ফিরে- আসার কোনো আশাই নেই ততদিন অন্তত দুঃখকষ্ট মেনে নিয়েই একরকম চলছিলো, অভ্যস্ত হ'য়ে গিয়েছিলো তাতে, কিন্তু এখন হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো একবার আশা জেগে উঠেই যদি মিলিয়ে য়ায় তখন হয়তো তাদের কচি মনে আশাভঙ্গের আঘাত আরো-তীব্র হ'য়ে পড়বে।

যতটা আশা ক'রে এসেছিলো, ততটা সম্ভবত আর ছিলো না ব'লেই মেরি নিশ্চয়ই সকালবেলায় একটু আড়ষ্ট সংকুচিত বোধ করছিলো; আর সেই অস্বস্তির জন্যেই,

চে

লেডি হেলেনা আর মেজর ম্যাকন্যাব্স তাদের যতই আপ্যায়ন করার চেষ্টা করুন না কেন, তারা একটু দূরে-দূরেই স'রে থাকছিলো। সেইজন্যেই লর্ড এডওয়ার্ড যখন জুড়ি- গাড়ি চ'ড়ে স্টেশন থেকে চৌদুনে ঘোড়া হাঁকিয়ে ফিরে এলেন, মেরি আর রবার্ট তখন ছিলো বাগানে।

লর্ড এডওয়ার্ড কোনোদিকে না-তাকিয়ে হনহন ক'রে সটান চ'লে গেলেন লেডি হেলেনার কাছে। ইংরেজ সরকারের বানিয়া মনোভঙ্গিতে তিনি বিচলিত ; আরো বিচলিত এই কথা ভেবে যে মুখে “গ্রেটব্রিটেন* “গ্রেটব্রিটেন” ক'রে ট্যাচালেও ইংরেজরা সত্যি- সত্যি স্কটিশ, আইরিশ বা ওয়েল্সবাসীদের মানুষ বলেই যে মনে করে না, আরো-একবার হাতে-নাতে তার প্রমাণ পেয়ে গিয়েছেন তিনি লগ্ুনে। বিস্তর যুক্তি সাজিয়েও নৌদফতরের কর্তাদের তিনি এ-বিষয়ে আদৌ বোঝাতেই পারেননি, যে হারানো মানোয়ারি জাহাজ ব্রিটানিয়ার সন্ধানে বেরিয়ে-পড়া তাদের আশু কর্তব্য।

তার মুখচোখের ভাব দেখেই লেডি হেলেনার বুঝতে মোটেই দেরি হয়নি যে লর্ড এডওয়ার্ডের লগুনসফর সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে-শুধু তা-ই নয়, কি-রকম যেন অপমানিতও বোধ করেছেন লর্ড এডওয়ার্ড গ্লেনারভন যখন উত্তেজিত স্বরে বললেন, “খামকাই শিয়েছিলুম নৌ-দফতরে-কোনো কাজই হয়নি, লেডি হেলেনা তখন আদৌ বিস্মিত হননি। বরং এই আশঙ্কা নিয়েই যে কাল রাতে মেজর ম্যাকন্যাবস আর তিনি বলাবলি করছিলেন, এ-কথা তার মনে পড়ে গেলো।

“তাদের মতে ব্রিটানিয়ার সন্ধানে বেরুনোটা হবে বুনোহাসের পেছনে ছোটা, আগের কথার জের ধ'রেই বললেন লর্ড এডওয়ার্ড।

এদিকে জুড়িগাড়ি এসে থেমেছে, গটগট ক'রে একজন সে-গাড়ি থেকে নেমে লিভিংরুমের দিকে চ'লে গেছেন, তাকে দেখেই অনুচর-পরিচরেরা সেলাম ঠকেছে- এইসব লক্ষ ক'রে মেরি আর রবার্ট বুঝতে পেরেছিলো যে ইনিই লর্ড এডওয়ার্ড গ্নেনারভন। তারাও, তাই, তার পেছন-পেছন লিভিংরুমে চ'লে এসেছিলো ঘরে ঢুকতে- ঢুকতে তারা শুনতে পেলে লর্ড এডওয়ার্ড বলছেন :

“হাজারটা ফ্যাকড়া, হাজারটা ওজর, হাজারটা আপত্তি সরকারের দু-বছর আগে যে-জাহাজ ডুবেছে-'

“ডুবেছে বলে আমরা এখনও সঠিক জানি না, লেডি হেলেনা বললেন, বরং বলতে পারি দু-বছর আগে সে নিরুদ্দেশ হ'য়ে গেছে_

হ্যা, আমিও তা-ই বলতে চেষ্টা করেছিলুম। কিন্তু তাদের বক্তব্য : ডুবুক বা হারিয়ে যাক-দু-বছর আগে যা ঘটেছে, এতদিন পরে কেউ খামকা এত টাকা খরচ ক'রে তার সন্ধানে যায় ! তাছাড়া তাদের মতে তিনটে পার্চমেন্টই অসম্পূর্ণ-_পুরো হদিশ কোনো পার্টমেন্টেই দেয়া নেই। কিন্তু, আসল কথা কি জানো, মাত্র তিনজনের জন্যে--সে

তিনজনও তো পুরোমানুষ নয়, নেহাৎই স্কট--একটা আন্ত গোটা জাহাজ তারা কিছুতেই পাঠাবে না! এরা যে শুধু বানিয়া, শুধু মুনাফাই দ্যাখে--তা নয়_এরা নিজেদের ছাড়া আর-কাউকেই ধর্তব্যের মধ্যেই আনে না।

লর্ড এডওয়ার্ড রাগের স্বরে তেড়ে কথা ব'লে যাচ্ছিলেন, কিন্তু সরকারের ফয়সালা শুনে তক্ষুনি মেরি আর রবার্ট নিজেদের আর সামলে রাখতে না-পেরে অস্ফুট স্বরে আর্তনাদ ক'রে উঠেছে : “বাবা ! বাবা !, যেন দ্বিতীয়বার মৃত্যু হয়েছে কাণ্তেন গ্রান্টের !

লর্ড এডওয়ার্ড এতটাই রেগে গিয়েছিলেন যে খেয়ালই করেননি কখন এই দুটি অচেনা কিশোর-কিশোরী এসে তার কথা শুনতে লেগেছে হঠাৎ এই অস্ফুট আর্তনাদ শুনে অবাক হ'য়ে তিনি জিগেস করলেন, 'এরা কে ?' তারপর সরাসরি তাদেরই তিনি জিগেস করলেন : “বাবা! কে তোমাদের বাবা?,

এবার লেডি হেলেনা সব কথা বুঝিয়ে দিলেন তার স্বামীকে কেমন ক'রে কাণ্তেন গ্রাশ্টের এই ছেলেমেয়ে দুটি খবরকাগজে বিজ্ঞাপন পণড়ে তক্ষুনি, তড়িঘড়ি, তার সঙ্গে দেখা করতে চ*লে এসেছে, বিজ্ঞাপনের বয়ান থেকে কতটা আশা তাদের মধ্যে জেগে উঠেছিলো নতুন ক'রে, ভেবেছিলো অবশেষে বুঝি সত্যি হদিশ মিলেছে কাণ্তেন গ্রান্টের- আর এখন তারা তার প্রতিবেদন শুনে কতটাই মর্মাহত হ'য়ে পড়েছে ! “এড, এরা তোমার বিজ্ঞাপন পড়েই কাল এখানে চ'লে এসেছে বলো, এখন এদের কী বলবে?

“কিছুই বলার নেই, হেলেনা। এতক্ষণ তো সে-কথাই বলছিলুম। নৌদফতর কিছুতেই একজন হারিয়ে-যাওয়া স্কটের উদ্দেশে কোনো জাহাজ পাঠাবে না-'

মেরির আত্মাভিমান প্রথর। এই কচি বয়সেই নানা দুর্বিপাকের মধ্যে পড়েও মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হয়েছে তাকে, দেখাশুনো করতে হয়েছে ছোটোভাইটির, অভিভাবকহীন অবস্থাতেও সে কোনোদিন দোরে-দোরে সাহায্য ভিক্ষা ক'রে বেড়ায়নি। এখন পুরো. ব্যাপারটা শুনে ইংরেজ সরকারের হৃদয়হীনতা সম্বন্ধে সে যতটাই রেগে যাক, মুখে সে-