নীহাররঞ্জন গুপ্ত

ঢু নাথ পাবলিশিং

৭৩ মহাত্মা গান্ধী রোড [এ কলকাতা-৭০০০০৯

পথম প্রকাশ সেস্টেম্বর ১৯৬২

[॥ শ্রকাশক 0 সমীরকুমার নাথ নাথ পাবলিশিং ৭৩ মহাত্মা গান্ধী রোড 0 কলকাতা ৭০০০০৯

0 অক্ষরবিন্যাস তনু্রী প্রিন্টার্স ২১বি রাধানাথ বোস লেন কলকাতা-৭০০ ০০৬

2) মুদ্রক 0 অজজ্তা প্রিন্টার্স ৬১ সূর্য সেন স্ট্রীট

কলকাতা-৭+০০ ০০৯

এক

১০ই মে ১৮৫৭।

সেদিনই প্রথম কোম্পানির বিরুদ্ধে গর্জে উঠল সিপাহীরা।

তবে শতাব্দীর শুরু থেকেই সিপাহীদের মনে অসন্তোষের কালো মেঘ জমতে শুরু করে।

দিলী।

মোগল বাদশা বাহাদুরের রাজধানী দিল্লী

বাদশা বাহাদুরের নিবাস সাম্রাজ্যের প্রাণকেন্দ্র লালকেল্লার সামনেই জমজমাট চাদনী চক। দুনিয়ার মানুষের যাবতীয় ভোগ্য কাম্যবস্তুর সম্ভার নিয়ে জমিয়ে বাবসা চলছে। গিজ গিজ করছে মানুষ চারদিকে। সালাউদ্দীনের চুড়ির দোকানের ভীড় উপচে পড়েছে রাস্তায়। তবু মিনিটে মিনিটে একা চড়ে বোরখা পরা বেগমরা যেমন আসছেন, তেমনি আসছে লম্বা ঘোমটা দিয়ে হিন্দু মেয়ে-বউরা। ভীড়ের মধ্যেও সালাউদ্দীন ওদের দেখে আদাব করে। অনুনয় করে বলে, মেহেরবানী করে একটু অপেক্ষা করুন।

পাশ দিয়ে যেতে যেতে বন্ধু কিষণটাদ মুচকি হেসে মন্তব্য করে, আরে দোস্ত! ঘাবড়াও মাত। তোমার চুড়ির জন্য সবাই হাসি মুখে দু'্চার ঘণ্টা অপেক্ষা করবে।

অপেক্ষমী করবে না কেন? যে দোকানের চুড়ি খোদ লালকেল্লার দেওয়ানী খাসের লাবণাময়ী বেগমদের পর্যন্ত মন জয় করেছে, তার দোকানে তো ভীড় হবেই। সবাই জানে অপেক্ষাও করতে হবে।

শুধু সালাউদ্দীনের চুড়ির দোকানেই না, ছগনলালের পানের দোকানেব সামনেও

অসম্ভব ভীড।

আরে মিয়া, তৃমি তো এত সকালে...

লালাজীর বেটা চন্দ্রকান্তর থুতনিতে একটা টোক্কা মেরে রশিদ মুচকি হেসে বলে, কী করব বলো£ নতুন বেগমকে পাশে না দেখেই ঘুম ভেঙে গেল। তাই.....

কথাটা শেষ না করেই রশিদ একটু থামে। তারপর বন্ধুর কানের কাছে চাপা গলায় বলে, রাতে নতুন বেগমের মধু আর দিনে ছগনলালের সুর্তি-পান খেয়েই তো বেঁচে আছি।

আশেপাশের এইসব দৃশ্য আর নানাজনের কলগুঞ্জন শুনতে গুনতেই মৌলানা সাহেব সদর বাজারের দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন। কিছু দুর যাবার পর দূর থেকে মুঙ্সীজীকে ওর দিকে এগিয়ে আসতে দেখে অবাক।

আদাব। মুন্সীজী। কোথায় যাচ্ছেন?

আবে মৌলানা সাহাব। আমি তো আপনার ওখানেই যাচ্ছিলাম কিন্তু আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

মৌলানা সাহেব ওর একটা হাত ধরে ,ছপ্তলেন, চলুন। চলুন। আমি আপনার ওখানেই যাচ্ছিলাম। খাস বাত হ্যায়।

আমিও তো খুব জরুরী কথা বলার জন্য আপনার কাছে যাচ্ছিলাম।

যাইহোক মুন্সীজীর কোঠিতে পৌঁছে এক গেলাস ঠাণ্ডা জল খেয়েই মৌলানা সাহেব পকেট থেকে একটা কাগজ বের করে চাপা গলায় পড়তে শুরু করেন। অনেক শ্রাণ। লন্ডনের রাজা আর কোম্পানির জন্য জান-প্রাণ লড়িয়ে লড়াই করে দখল করেছি কলকাতা থেকে পেশোয়ার ।”

মুন্গীজী মাথা নেড়ে বলেন, সাচ্চা বাত! আর এর জন্য আমরা কী পুরস্কার পেলাম।

মৌলানা সাহেব মুহূর্তের জন্য ওর দিকে তাকিয়েই আবার কাগজখানার উপর চোখ রেখে বলেন, হ্যা, পুরস্কারের কথাও বলছি।

“যারা আগে দু'শ টাকা কর দিয়েছে, তারা এখন তিন শ' দিতে বাধ্য হচ্ছে যারা আগে চার শ' দিয়েছে, তাদের দিতে হচ্ছে পাঁচ শ'।....৮

মুন্সীজী মাথা নেড়ে বলেন, বিলকুল ঠিক।

“পায়ে হেটে এক জেলা থেকে অন্য জেলা যেতে হলেও দিতে হচ্ছে কর। গরুর

১০

গাড়ি-মোষের গাড়ি করে গেলে কর দিতে হচ্ছে চাব আনা থেকে আট আনা |...”

“দশ গুণ বাড়ানো হয়েছে চৌকিদারী ট্যাক্স। সব গুণী-মানী ব্যক্তিদের “পশা হয়েছে নিষিদ্ধ, বন্ধ হয়েছে সব রকমের রোজগারের পথ। এদের সহ্য করতে হচ্ছে অনাহার আর দারিদ্র্যের জ্বালা ।.....

মৌলানা সাহেব মুখ না তুলেই বলেন, এবার শ্রনুন।

হ্যা, হ্যা, শুনছি।

“সর্বোপরি সমস্ত হিন্দুস্থানবাসীর ধর্ম ধবংস করার ভীদ্যোগ নিয়েছে কোম্পানি।”

এইবার মৌলানা সাহেব মুখ তুলে মুপীজীর দিকে তাকিয়ে বলেন, শুনলেন সব কিছু?

শুনলাম বৈকি।

উনি মুহৃর্তেব জনা থেমে প্রা আপন মনেই বলেন, তাহলে যা শুনেছিলাম, তা সত্যি!

মৌলানা সাহেব জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে যুপীজীর দিকে তাকিয়ে বলেন, আপনি কী গুনেছিলেন?

আজ সকালে হাকিম সাহেব যখন জুম্মায় নামাজ পড়ে ফিরছিলেন, তখন হণাৎ আমার সঙ্গে দেখা। তখনই উনি এইরকম একটা ইস্তাহারের কথা বলছিলেন কিন্তু তখন ঠিক বিশ্বাস করতে পারিনি।

মুলীজী সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন করেন, মৌলানা সাহাব, আপনাকে ইত্তাহার কে দিয়েছে?

আপনি তো জানেন মুলীজী, আমি রোজ রান্তিরে শোনাব আগে কোরানের কিছু অংশ পড়ি ।....

জানব না কেন?

কাল রাত্তিরে যখন কোরান পড়ছিলাম, ঠিক তখনই কে যে ইসত্তাহারটা আমার দিকে ফেলে দিয়েই পালিয়ে গেল, তা বুঝতে পারলাম শা তবে এই ইস্তাহারের নীচে লেখা আছে, দিল্লীবাসী হিন্দু মুসলমানদের তরফ থেকে এই ইস্তাহার জারি করা হলো।

দু" পাঁচ মিনিট চুপ করে থাকার পর মুন্গীজী বললেন, তবে আমার মনে হয় কোম্পানির সিপাহীরাই এই ইস্তাহার প্রকাশ করেছে।

একটু ভেবে মৌলানা সাহেব মাথা নেড়ে বললেন, কিন্তু মুন্সীজী, সিপাহীদের কি এত সাহস হবে?

দেখুন মৌলানা সাহাব, একটা কথা মনে বাখবেন, আমাদের মত মানুষ না,

৯৯

সিপাহীদের জনাই কোম্পানি একটার পর একটা রাজ্য জয় করেছে। তাছাড়া এইসব যুদ্ধ-বিগ্রহে সিপাহীরাই জখম হচ্ছে বা মরছে। তারা কোম্পানির আসল চরিত্র মতলব যত ভাল বুঝবে, তা আমি বা আপনি বুঝব না।

ঠিক বলেছেন মুন্সীজী।

১৮০৬।

স্যার জন বার্লো তখন গভর্নর জেনারেল

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির তরফ থেকে ইনি হুকুম জারী করলেন, কলকাতা, বোম্বে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সীর সামরিক কর্তৃপক্ষ নিজেদের বিবেচনা মত আইন- কানুন বিধি-নিষেধ জারি করতে পারবে।

সে সময় সিপাহীরা নিজের নিজের ধর্মের গোষ্ঠীর পরিচয় চিহ ললাটে ধারণ করতো ধর্মের নির্দেশে মেনে অনেক সিপাহী দাড়ি রাখতো। তবে সব সিপাহীদের মাথায় থাকতো পাগড়ি।

মাত্রাজের সাময়িক কর্তৃপক্ষ হুকুম জারি করলেন, নো, নো, নো। ওসব নেহি চলেগা। ব্লাডি নেটিভ সিপাহীরা ক্লাউন সেজে থাকবে, তা বরদাস্ত করা হবে না। দে মাস্ট পুট অন ক্যাপস্। পাগড়ির বদলে প্রত্যেককে টুপি পরতে হবে।

শুধু কি টুপি?

না, না, শুধু টুপি না। প্ুতোক টুপিতে থাকবে লেদার ব্যাজ।

চামড়ার ব্যাজ?

হ্যা, হ্যা, চামড়ার।

এই সর্বনাশা ফতোয়া জারির খবর শুনেই হিন্দু-মুসলমান সিপাহীরা চঞ্চল হয়ে ওঠে। সবার মুখেই এক প্রম্ন-কোন পশুর চামড়া দিয়ে তৈরি হবে এইসব ব্যাজ?

গরু? নাকি শুওর?

না, না, ব্যাজ বাবহার করা সম্ভব না। হিন্দু-মুসলমান সিপাহীরা' এক যোগে প্রতিবাদ করলে'। ওরা সন্দেহ করলো, কোম্পানির সামরিক অফিসারদের অভিপ্রায়, হিন্দু মুসলমান সিপাহীবা হিন্দু ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রীস্টান ধর্ম গ্রহণ ককক।

এই চামড়ার ব্যাজ ব্যবহারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠল ভেলোরের হিন্দু-মুসলমান সিপাহীরা।

ইংরেজ সন্দেহ করল, টিপু সুলতানের চক্রান্তেই সিপাহীরা বিদ্রোহ করেছে।

১২

এর ঠিক আঠারো বছর পরের কথা।

১৮২৪।

বার্মা আসাম দখল করে নেবার পর থেকে মাঝে-মাঝেই টুকটাক সংঘর্ষ আর বিরোধ চলছিল ইংরেজদের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত ১৮২৪ সালে বার্মার সঙ্গে যুদ্ধ শুরু হলো ইংরেজদের।

কোম্পানি কলকাতা আর মাদ্রাজেব সামরিক কর্তৃপক্ষকে হুকুম দিল, অবিলম্বে সিপাহীদের বার্মা পাঠাও।

আসাম আর আরাকান হয়ে স্থলপথে বার্মা যেভে আপত্তি ছিল না ব্যারাকপুরেব ৪৭ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সিপাহীদের কিন্তু হিন্দু সপাহীরা স্পষ্ট ভাষায় ইংরেজ অফিসারদের জানিয়ে দিল, জাহাজে ৯ডে কালাপানি পার হতে পারব না।

হোয়াই ? জাহাজে যাবে না কেন?

স্যার, ধর্মের নিষেধ আছে। কালাপানি পার হলেই আমাদের ধর্ম চলে যাবে। আমরা ধর্মচ্যত হবো।

ননসেন্স!

ইতিমধো মাদ্রাজের সিপাহীবা সমুদ্র পথেই বার্মা রওনা হলো।

সঙ্গে সঙ্গে ব্যারাকপুরের সিপাহীদেব হুকুম দেওয়া হলো মল বাইট। তোমরা যখন জাহাজে যাবে না, তখন তোমরা এখুনি গরু-মোষ-ঘোড়ার গাড়িতে বার্শার পথে যাত্রা শুরু করো।

ইংবেজ অফিসারদের হুকুম গুনে সিগাহীরা স্তন্তিভ হয়ে যায ওরা লে, স্যাব, আমরা গরু-মোষ-ঘোড়ার গাড়ি পাবে! কোথায়? সব গাড়ি তো আগেই !কাম্পানি নিয়ে নিয়েছে।

ইউ ব্রাডি নেটিভস' গুসপ ওজব-আপত্তি তামরা শুনবো না। ইউ স্টা) ইমিডিযেটলি।

ঠিক এই সন্য সিপাহীরা জানতে পারলো, ওরা ৯উখ্াম পৌছবার সঙ্গে সঙ্গেই পোম্পাতি জোর করে গদেব জাহাঙে চডিষে দেবে তাডাভাড়ি বার্ম! পৌঁছবর জন্য।

হিন্দু সিপাহীরা আরো ক্ষেপে উঠল।

প্রধান সেনাপতি স্যার এডওয়ার্ড প্াাগেট হুঙ্কার দিলেন, আই উইল নেভার টলারেট দিস ইনডিসিগ্রিনড্‌ ব্াডি বাস্টাড হিন্দু সিপাহীজ।

প্রধান সেখ।পতির হঞ্ধীবেও হিন্দু সিপাহীবা বিন্ুমাএ পিচহিও হয় না। ওল! পা?)

হুঙ্কার দেয়, শুঙ্খলারক্ষার চাইতে ধর্মরক্ষা অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

হোয়াট? সামান্য নগণ্য হিন্দু সিপাহীরা আমার হুকুম মানবে না?

প্রধান সেনাপতি স্যার এডওয়ার্ড হুকুম দিলেন, ফায়ার! মারো বাস্টার্ড হিন্দু সিপাহীদের।

গুলি খেয়ে এক দল সিপাহীর প্রাণহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়তেই প্রধান

সঙ্গে সঙ্গে গুলি করা বঙ্ধ হয়।

না, এক দল হিন্দু সিপাহীকে খতম করেই উনি খুশি হতে পারেন না। বলেন, বাকি বিদ্রোহী সিপাহীদের ফাসি দাও।

স্যার এডওয়ার্ড মুহূর্তের জন্য থেমে বলে, সিপাহীদের মৃত্যু হবার পরও ওদের "দহ সৎকার হবে না। বেশ কয়েক দিন ওদের মৃতদেহ গাছ থেকে ঝুলে থাকবে। ন্য সিপাহীরা দেখুক, বিদ্রোহ করলে ওদের কি পুরস্কার জুটবে।

এই বছরেই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উৎসাহে ভারতীয় সভ্যতা সংস্কৃতির উন্নতির জন্য ৬৬ নং বৌবাজজার স্ট্রীটের ভাড়া বাড়িতে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয। আবার এই বছরের শুরুতেই জন্ম হলো মাইকেল মধুসদন দত্তের

দুই

যোল শ' নব্বই সালের তুমুল বর্ষাব দিনে জোব চার্নক দলবল নিয়ে সুতানুটির হাটখোলা বা রথতলা ঘাটে নামেন এবং নিজেদের বসবাসের জন্য কয়েকটা মাটির ঘর তৈবি করেন।

ভারতে ইংরেজ সাম্রাজ্য বিস্তারের সেই প্রথম পদক্ষেপ।

নবাব বাহাদুরের অনুমতি নিয়েই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী শুরু করলো ব্যবসা- বাণিজ্য এবং কোম্পানির আমলাদের কৃপায় অর্থলাভ করে, সৃষ্টি হলো একদল স্তাবকের।

না, নবাব বাহদুর সেজন্য বিচলিত বোধ করেন না।

মাত্র পঞ্চাশ-পঞ্চানন বছরের মধোই যেভাবে কোম্পানি তাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি,

১৪

ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থ-সামর্থা সর্বোপরি সৈন্যবল বৃদ্ধি করলো, তাতে নবাব বাহাদুর সত্যি চিন্তিত হলেন। কোম্পানি কলকাতা শহরের মধ্যে শুধু দুর্গ তৈরি করেই থামলো না। সৈন্যবাহিনীকে আরো শক্তিশালী করা হলো; বিলেতও থেকে আনা হলো অফুরন্ত গোলা-বারদ আর অসংখ্য কামান।

আকণ্ঠ সুরাপান দিবারাত্রি নারীসঙ্গ উপতোগ করেও নবাব সিরাজদ্দৌল্লার মনে শান্তি নেই।

না, না, শুধু ব্যবসা-বাণিজ্য রক্ষার জনা এত গোলা-বারুদ-কামান বিশাল সৈন্যবাহিনীর আয়োজন করেনি কোম্পানি। ওরা কি বাংলার মসনদ দখল করতে চায়?

নবাব আর কালবিলম্ব না করে বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে কলকাতা নাক্রমণ কবলেন এবং কোম্পানির সৈন্যবাহিনীকে পরাজিত করে কলকাতা দখল করলেন।

ঠিক সাত মাস পরে ক্লাইভ আর ওয়াটুসনের নেতৃত্বে কোম্পানির সৈন্যবাহিনী নবাব-বাহিনীকে পরাজিত করে কলকাতা দখল করলো।

নছর ঘুরে যাবার আগেই পলাশীর যুদ্ধে ক্লাইভের সৈন্যবাহিনীর কাছে নবাব- বাহিনীর পরাজয়। সিরাজের হত্যা। কোম্পানির কৃপায় নবাব হলেন আলিবদ্দী খা-র জামাতা মীরজাফর আলি।

মীরজাফর আলিকে গদিতে বসিয়েই কোম্পানি জানিয়ে দিল, সিরাজ-বাহিনীর আক্রমণে কলকাতার বু ঘরবাড়িই শুধু ধবংস করা হয়নি। তারা লুঠ করেছে লক্ষ লক্ষ টাকার সম্পত্তি। সুতরাং সেইসব ক্ষতির খেসারত দিতে হবে বর্তমান নবাবকে।

মীরজাফর এক কথায় ওদের দাবী মেনে নিলেন। সিরাজের কলকাতা আক্রমণের এক বছর পরে-_সতের শ" সাতান্নর ৬ই জুলাই মুর্শিদাবাদ থেকে একশ' নৌকায় সাতশ' কাঠের বাক্স ভর্তি হয়ে এলো ক্ষতিপূরণের প্রথম কিস্তি ছিয়ান্তর লক্ষ টাকা। দু'সপ্তাহ পরে এলো আরো চল্লিশ লক্ষ টাকা। তারপর আরো মোট এক কোটি সত্তর লক্ষ টাকা।

ক্ষতিপূরণের বারো আনা টাকাই গেল কোম্পানির এক দল ইংরেজ কর্মচারীর পকেটে ; চার আন! এলো স্থানীয় বাসিন্দাদের হাতে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে শোভারাম বসাক, রতন সরকার, গোবিন্দরাম রঘুরাম মিত্র. নীলমণি মিত্র আলিজান ভাইয়ের মত কোম্পানির আমলাদের প্রিয়পাত্রদেরই কপালে শিকে ছিড়ল। গ্োবিন্দরাম মিত্র কোম্পানির তহবিল তছরুপ করেও /রহাই পেয়েছিলেন।

এসব ইতিহাস। অনেক দিন আগেকার কথা।

পলাশীর যুদ্ধে জয়লান্ভের পর পরই কোম্পানি ঠিক করলো, কালবিলম্ব না ক'রে

এবার ঝড়ের বেগে এগুতে হবে। দখল করতে হবে সমগ্র বঙ্গদেশ, তারপর সমগ্র ভারত।

দেখতে দেখতে কত কি ঘটে যায় সারা দেশে দিন দিনই বদলে যায় কলকাতা যাবে নাঃ এত নোংরা, এত অপরিচ্ছন্ন শহরে কি ইংরেজরা থাকতে পারে? তাছাড়া ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর, ওলাওঠা ; আরো কত রকমের মারাত্মক অসুখ। এইসব অসুখ-বিসুখে কোম্পানির লোকও কম মরল না।

সুতরাং পলাশীর যুদ্ধের ছ'সাত বছর আগে থেকেই কলকাতায় নর্দমা তৈরির প্রারম্তিক কাজ কোম্পানি শুরু করে ; মশা মাছি পোকা-মাকড়ের প্রকোপ কমাবার জন্য শুরু হয় চৌরঙ্গীর জঙ্গল পরিষ্কার। হাত দেওয়া হয় লালদীঘির উন্নতিতে পলাশীর যুদ্ধের প্রায় তিরিশ বছর আগেই কোম্পানি চালু করেছে “মেয়র-কোর্ট'। তবে যুদ্ধে জয়ের পরই কোম্পানি সিদ্ধান্ত নেয়, প্রাণদণ্ডে দণ্তিত অপরাধীদের বেত মেরে মারা হবে না; তোপের মুখে ওদের উড়িয়ে দেওয়া হবে। চালু হলো কলকাতা মুর্শিদাবাদের মধ্যে ডাক ব্যবস্থা ; মাত্র তিরিশ ঘণ্টায় পৌঁছে যায় চিঠিপত্র কয়েক বছর পর ডাক ব্যবস্থা প্রসারিত হলো ব্যারাকপুর-হুগলী-চন্দননগর থেকে ঢাকা- ট্টগ্রাম, বারাণসী থেকে কটক-গঞ্জাম পর্যন্ত। ইতিমধ্যে কলকাতায় চালু হয়েছে কোম্পানির টাকশাল।

আরো আরো কত কি হলো কলকাতায়। কাচা রাস্তা পাকা হলো, তৈরি হলো ফোট উইলিয়ম, চালু হলো সুপ্রীম কোট, শুরু হলো৷ ঘোড়দৌড়-ক্রিকেট খেলা। যাতায়াতের জন্য শুধু পালকি না, শুরু হলো দুই চার স্প্রিংওয়ালা বগী গাড়ির চলন। আলু তখনো চালু না হলেও সতেরশ' চুরানব্বইতে এসে গেল বাধা কপি। কাগজে বিজ্ঞাপন বেরুল-“যীহারা বাঁধা কপির লোভনীয় আস্বাদনে তৃপ্তিলাভ করিতে চান, তাহারা টাদপাল ঘাটের সান্নিধ্যে, পুরাতন অর্ফান হাউসের একটু দক্ষিণে, কাণ্তেন ম্যাকিন্টারের বাগানে অনুসন্ধান করুন। এক শত কপির দাম--৮সিকা টাকা।”

পত্র-পত্রিকার তো অভাব নেই। সে সব পত্র-পত্রিকায় নানা ধরনের বিজ্ঞাপনও ছাপা হচ্ছে। এক কাগজে বিজ্ঞাপন বেকলো, লালবাজারে বাঘ বিক্রি, অন্য কাগজে গাড়িওয়ালা স্টয়ার্ট কোম্পানি বিজ্ঞাপন দেয়, আটশ' টাকায় বিলাতী গাড়ি বিক্রির কখনও কখনও বিচিত্র বিজ্ঞাপনও ছাপা হয়। যেমন__

“আমার পায়ে কঙকগুলি হওয়ায় বড়ই কষ্ট পাইতেছি। যে লোক এই কড়াগুলি আরাম কণিয়া দিতে পারিবে, তাহাকে এক হাজার সিকা টাকা পারিততোথক দিব ' ৮০ নং গ্িগজগাগ লেনে সংবাদ লন 1”

কোম্পানির উৎসাহে কলকাতায় নাচ-গান-থিয়েটার হল তৈরি হলো. প্রতিষ্ঠা হালো ক্লাব, বৈঠক বসে নাচ-গান-মদ্যপানের। চৌরঙ্গী তার আশেপাশে আকাশচম্বী সুন্দর সুন্দর পাকা বাড়ি, ফিটন আর বগী চড়ে সাহেব-মেমসাহেব আর কিছু ধনী বাঙালি নিকেল-সন্দেয় ময়দানে হাওয়া খেয়ে ঘুরে বেড়ান।

এক কথায় কলকাতা তখন গুধু কল্লোলিনী না, মহানগরীও হয়ে গেছে।

শোতাবাজারে অঘোর বসাকের চণ্ডীমণ্ডপের সামনে বারান্দায় ঘনিষ্ঠ পাত্র- মিপ্রদের দৈনন্দিন অপরাহুকালীন বৈঠকে ইতিমধ্যেই অনেকে হাজির হয়েছেন। সবার সুখেই হাসি : ব্যতিক্রম শুধু নিধিরাম মিত্তির।

অন্দর বসাক তাকিয়'য় হেলান দিয়ে গড়গড়ায় একটা টান দিয়েই বলেন, কি হালে মিত্তিরশাই, অজ মুখে হাসি নেই কেন? শরীর সুস্থ আছে তো?

নিধিরাম মিন্তির একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, আজে। শরীর ভালই আছে ৩1...

না, উনি কথাটা শেষ করেন না।

তবে কি?

বলরাম মুখুজ্যে নিধিরামেব বিশেষ বন্ধু। তাই তিনি একট হেসে বলেন, তবে কি স্ট্রী-সুখে বঞ্চিত হয়েছ?

হ্যা, বলরাম, আমি সত্যি সত্যি স্ত্রী সুখে বঞ্চিত হচ্ছি।

তিন-চারজন এক সঙ্গে প্রন্ন করেন, কেন£ কেন?

বলরাম বলেন, নিধিরাম, একটি নয়, দুটি নয়, তোমার সাত-সাতটি স্ত্রী ; তবুও তমি স্ত্রী সুখে বঞ্চিত হচ্ছো?

আরে ভাই, আমার দুটি স্ত্রী পিত্রালয়ে থাকে, তা কি তুমি জানো না?

হ্যা জানি বৈকি কিন্তু অন্য পাঁচজন স্ত্রী তো তোমার কাছেই থাকেন।

বড কউ প্রায় নিত্যই শয্যাশায়ী থাকেন। মেজ বউ সংসার নিয়ে ব্যস্ত, সেজ বউ পজোর ঘর সামলানো ছাড়া আমার বৃদ্ধা মাকে দেখাশুনা করতেই হিমসিম খেয়ে যাচ্ছে...

অনা পদ জন?

বলছ, প্ণাহি!

নিপিরাম এববার নিঃশ্বাস নিয়ে বলেন, এই ছোট দু'জনই আমার দেখাশুনা (সবা-খঞ্জ করতে সঠি। কথা বলতে কি এই দ'জনের ব্পের-গুণের যেমন তুলন'

১৭

হয় না, তেমনি আমাকে সুখে রাখতে, আনন্দে রাখতে ওদের চেষ্টায় বা আগ্রহের সীমা নেই।

তবে আবার দুঃখ করছো কেন?

ওরে বাপু, ওরা দু'জনেই গর্ভবতী। তারমধ্যে একজন তো আসন প্রসবা।

সবার মুখেই হাসি।

বলরাম চাপা হাসি হেসে বলেন, কপালগুণে ওরা দু'জন স্বামীর সোহাগ ভালবাসা পেয়ে গর্ভবতী হয়েছে, সে তো আনন্দের কথা৷

ওহে বন্ধু এখন যে আমাকে দেখাশুনা করার কেউ নেই।

অঘোর বসাক গড়গড়ায় শেষ টান দিয়ে এক গাল ধোঁয়া ছেড়েই বলেন, মিত্তির, তুমি সত্বর বিয়ে করো।

এই বয়সে আবার বিয়ে করবো?

হ্যা, হ্যা, করবে।

বসাক মশাই মুহূর্তের জন্য থেমে বলেন, সব চাইতে বড় কথা, তুমি কুলীন কায়েত। তুমি স্বচ্ছন্দে পাঁচিশ-তিরিশটা বিয়ে করলেও কেউ নিন্দা করবে না।

আরে দাঁড়াও, দীড়াও ; আমাকে বলতে দাও।

বসাক মশাই বলে যান, তোমার বয়স মাত্র পঞ্চাশ...

আজ্ঞে পঞ্চান্ন।

এঁ একই ব্যাপার। তুমি রূপবান, স্বাস্থ্যবান, কোম্পানির অধীনে কাজ করে বেশ ভাল আয় করো...

আজ্জে হ্যা, তা করি।

এই কলকাতা শহরে তুমি প্রায় সাহেবদের মতই বিরাট পাকা বাড়ি তৈরি করেছ, গ্রামেও যথেষ্ট জমিজমাও করেছ...

নিধিরাম গদ গদ্‌ হয়ে বলেন, কিছু না হলেও ষাট-সত্তর বিঘে জমি কিনেছি গত পাচ বছরে।

বসাক মশাই একগাল হেসে গলা চড়িয়ে বলেন, মিত্তির, তোমাকে কন্যাদান করে ধন্য হবে মেয়ের বাপেরা।

বলরাম নিজের উরুতে এক থাপ্নড় মেরে বলেন, ঠিক বলেছেন বসাক মশাই।

নিত্যহরি নাকে নস্যি দিয়ে মৃদু হেসে বলেন, নিধিরাম, আমার স্বর্গীয় পিতৃদেব প্রায় শতখানেক বিয়ে করেছিলেন। আমার গর্ভধারিণী ছাড়া এগারজন বিমাতা আমাদের" বাড়িতেই থাকতেন। আমার অন্য বিমাতারা পিত্রালয়েই থাকতেন।

*১৮

পিতৃদেব ঘুরে-ফিরে ওদের প্রতোকের কাছে যেতেন।

অঘোর বসাক একটু বিরক্ত হয়েই বলেন, ওরে বাপু, তোমার বাপের কথা ছাড়ো যদি নিজের বিষয়ে কিছু বলতে চাও, তাই বলো।

হ্যা। বলো।

নিত্যহরি কাতর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে বলেন, আমি জীবনে কোনদিন আমার গর্ভধারিণী আর বিমাতাদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ দেখিনি কিন্তু আপনি ভাবতে পারবেন না। আমার ছোট তিন গৃহিণী প্রতি রাত্রে কি বিচ্ছিরি ঝগড়া-ঝাটি করে!

কেন? কেন?

নিত্যহরি একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, আমার কনিষ্ঠতম বউ প্রায় স্বর্গের অন্সরাদের মতই সুন্দরী। ওকে দেখলেই আমার কামনা-বাসনার আগুন জ্বলে ওঠে ।....

বাঃ! সে তো অত্যন্ত আনন্দের কথা।

বসাক মশাই প্রায় না থেমেই বলেন, যেব্ত্ী স্বামীর মনে কামনা-বাসনার আগুন স্বালাতে না পারে, সে স্ত্রী তো মৃতবৎ!

নিধিরাম বলেন, নিত্য, তোমার স্ত্রীরা ঝগড়া করে কেন, তা তো বললে না।

হ্যা, ভাই, বলছি।

নিত্যহরি একটু চাপা হাসি হেসে বলেন, সত্যি কথা বলতে কি, আমি সর্বকনিষ্ঠাকে নিয়েই রাত কাটিয়ে সব চাইতে বেশি আনন্দ পাই কিন্তু.....

বলরাম ওর কথার মাঝখানেই একটু হেসে বলেন, অন্য দুই বউ তা সহ্য করতে পারে না, তাই তো?

হ্যা, ঠিক তাই।

অঘোর বসাক শুধু ধনী না, নারী সংক্রান্ত বিষয়েও অত্যন্ত অভিজ্ঞ। এবং বেশ বিচক্ষণ। তার বিচক্ষণতার উপর এইসব পাত্র-মিত্রদের অগাধ বিশ্বাস আস্থা তাইতো নিত্যহরি তার সুবিবেচনাপূর্ণ পরামর্শ প্রার্থনা করেন, বসাক মশাই, আপনিই বলুন আমার কি করণীয়।

অঘোর বসাক গুরুগস্তভীর হয়ে বলেন, দেখো নিতাহরি, আমরা বিয়ে করি, উপপত্বী বা রক্ষিতার কাছে যাই শুধু একটু সুখ আর আনন্দের জন্য। যে স্ত্রী উপপত্বী বা রক্ষিতা আমাদের সেই সুখ আর আনন্দ দেবে, আমরা অবশ্যই তার কাছে যাব।

সম্মতিতে সবাই মাথা নাড়েন।

উনি বলে যান, যে নারী আমাদের পরিপূর্ণভাবে সুখ বা আনন্দ দিতে না পারে,

১৭)

তাকে তো আমাদের বর্জন করতেই হবে।

নিত্যহরি ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করেন, তাহলে অন্য দুই স্ত্রীকে ত্যাগ করতে বলছেন!

না, না, ঠিক তা বলছি না।

তবে?

তুমি ওদের পিত্রালয়েও পাঠাতে পারো, আবার তোমার কাছেও রাখতে পারো মোদ্দা কথা ওদের স্পষ্ট বলে দেবে, ওরে মাগী, তোদের মধু খেয়ে আমার মন ভরে না বলেই তো নতুন বউকে ঘরে এনেছি।

কিন্তু কি?

বসাক মশাই, ওদের দু'জনেরও বয়স বেশি না ; মোটে একুশ-বাইশ। দু'জনের দেহেই যৌবনের জোয়ার। ওদের দূরে সরিয়ে দিলে যদি ওরা দ্বিচারিণী হয়?

ওর কথা শুনে বসাক মশাই হো হো করে হেসে ওঠেন। তারপর বলেন, ওর দ্বিচারিণী তো হবেই এবং হওয়াই তো স্বাভাবিক কিন্তু তাতে আপনার কি?

কিন্ত...

নিত্যহরির মুখে আবার কিন্তু শুনেই উনি দপ্‌ করে জ্বলে ওঠেন, আরে দূর মশাই! পুরুষ হয়ে আবার এত কিস্তু কিন্ত করলে চলে?

পরিস্থিতির মোড় ঘুরাবার জনা বলরাম মুখুজো বলেন, আচ্ছা বসাক মশাই আপনার একাধিক পত্রীও আছে, একাধিক উপপত্বী বা রক্ষিতাও আছে। আপনি বি করে সব দিকে সামাল দেন?

চাকর নতুন করে তামাক সেজে গড়গড়ার নল এগিয়ে দিতেই অঘোর বসাব চোখ বুজে পর পর কয়েকটা টান দিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছেড়েই একটু হাসেন। তারপর বলেন, বলরাম, আমি তা তোমার মত বামুনও না, মিত্তিরের মত কুলীন কায়েতও না। তাই দশ-বিশটা বিয়ে করতে পারিনি।

উনি সঙ্গে সঙ্গেই বলেন, তোমরা নিশ্চয়ই সকার করবে শতখানেক বউ পোষার মত অর্থবল আমার আছে।

পাত্র-মিত্ররা এক যোগে বলেন, নিশ্চয়ই আছে।

আমি মাত্র দুটো! বিয়ে করেছি এবং নিশ্চয়ই স্বীকার করবো, ওদের দু'জনেব সঙ্গেই সহবাস করে আমি তৃপ্তিলাভ করেছি।

বসাক মশাই একটু থামেন। গড়গড়ায় দু' একটা টান দেন। তারপব একটু হেসে বলেন, তোমরা নিশ্চয়ই স্বীকার করবে, আমরা পুরুষরা দু'একটা তো দূরের কথা দশ-বিশটা নারী উপভোগ করেও পরিপর্ণ ত।প্তলাভ করি না'

নিধিরাম মিত্তির এক গাল হেসে বলেন, আপনি ঠিক মনের কথাটি বলেছেন।

ওহে নিধিরাম, আমাকে কোনদিন একটি বাজে কথা বলতে শুনেছ?

না, না, জীবনেও শুনিনি!

ইতিমধ্যে সূর্য অস্ত যায়। এক প্রবীণা ঝি এসে চণ্তীমণ্ডপে প্রদীপ রেখে যায়। অন্দরমহলে শঙ্খ বেজে ওঠে।

অঘোর বসাক চোখ বৃজে দু'হাত কপালে ঠেকিয়েই আপনমনে বলেন, মাগো, তুমি কৃপা করো এই অধম সন্তানকে

অন্যান্যরাও দু'হাত কপালে ঠেকিয়ে পরমেশ্বরের উদ্দেশে প্রণাম জানান।

ব্যস! সঙ্গে সঙ্গে দু'জন চাকর প্রত্যেকের হাতে সরবতের গেলাস তুলে দেয়।

গেলাসে চুমুক দিয়েই বলরাম পরম তৃপ্তির হাসি হেসে বলেন, আঃ! চমৎকার !

অঘোর বসাক সঙ্গে সঙ্গে চাপা হাসি হেসে বলেন, ওহে ভায়া, তোমাদের সাধারণ সিদ্ধির সরবত দেওয়া হয়নি। এই সরবতের এমন সব দ্রব্য মেশানো আছে যে তাদের গুণ রাত্তিরে বুঝতে পারবে।

নিতাহরি আর নিধিরাম শ্রায় একই সঙ্গে বলেন, বসাক, মশাই, রাত্তিরে কি হবে? কি হবে?

বসাক মশাই ভুরু নাচিয়ে বলেন, আজ রা্তিরে স্ত্রীর সঙ্গে সহবাস করার সময় বুঝবে এই সরবতের কি গুণ।

সবার মুখেই খুশির হাসি ফুটে ওঠে।

এই সরবত নিত্য সেবন করি বলেই পাঁচ-পীঁচটা উপপত্বীকে মহানন্দে রেখেছি আর নিজেও মহানন্দে থাকি।

হঠাৎ বলরাম মুখুজ্যে বলেন, বসাক মশাই, আপনি তে৷ বললেন না, কি করে স্ট্টী আর উপপত্রীদের সামলাচ্ছেন।

হ্যা, হ্যা, বলছি।

অঘোর বসাক স্ানাদি সেরে এক পেট লুচি-তরকারী আর মিষ্টি খেয়েই পাক্কি চড়ে সোজা গদিতে যান। কার কাছ থেকে কত সুতা আমদানী হলো, কোন কোন তাতিকে কত সুতা দেওয়া হলো, তাতিরা কে কত কাপড় এনেছে, কত কাপড কোথায় বিক্রি হলো, কত নতুন অর্ডার ইত্যাদি ছাড়াও কত টাকা জমা পড়লো আর কাকে কত টাকা দেওয়া হলো, তার পাই পয়সার হিসেব পর্যস্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন বসাক মশাই।

২৯

ম্যানেজারবাবু!

আজ্ঞে হ্যা, বলুন।

কাল বিকেলে-সন্ধেয় কোনো সাহেব এসেছিল ধার চাইতে?

আজ্জে হ্যা, চারজন সাহেব এসেছিল।

কে? কে?

দ্ু' জন আমাদের পুরনো খদ্দের ; দু'জন নতুন।

বসাক মশাই মুখ তুলে তাকাতেই ম্যানেজারবাবু একটু হেসে বলেন, লেহ্যাম সাহেব আরো একটা মাগী রেখেছেন।

বেচারীরা সাত সমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে এদেশে এসেছে। বিয়ে করা বউ আসেনি ম্যালেরিয়া-কালাজ্বরের ভয়ে। তাই একটু-আধটু স্ফৃর্তি না করে কি থাকতে পারে?

উনি সঙ্গে সঙ্গেই প্রম্ম করেন, লেহ্যাম কত টাকা চেয়েছে?

আজ্জে দু'হাজার।

আগের টাকার সুদ ঠিক মত দিচ্ছে তো?

আজ্ঞে হ্যা; কাল পাই পয়সা পর্যস্ত মিটিয়ে দিয়েছে।

তবে ম্যানেজারবাবু, একটা কথা মনে রাখবেন।

আজ্ঞে বলুন।

কোম্পানির কর্মচারী ছাড়া অন্য কোন সাহেবকে যেন এক পাই পয়সাও ধার দেওয়া না হয়।

তাই কি দিই!

যে দুই নতুন সাহেব ধার চাইছে, তারা কি কোম্পানির কর্মচারী?

একজন কোম্পানির রাইটার, অন্যজন ব্যবসা করে।

যে ব্যবসা করে তাকে ধার দেবেন না। আর হ্যা, কখনই কাউকে এক সঙ্গে দু'হাজার টাকার বেশি ধার দেবেন না।

না, না, তা কখনই দেওয়া হয় না, হবেও না।

মধ্যাহদভোজনের পর বিশ্রাম। দুটি দাসী হাত-পা টিপে দেয়। দিনের বেলায় বউদের কর্তার ঘরে আসা নিষেধ দাসীদের সেবা নিতে নিতেই বসাক মশাই ঘুমিয়ে পড়েন ঘুম থেকে উঠে সেজেগুজে পাত্র-মিত্রদের নিয়ে আসর।

দু'এক ঘন্টা নিছক আড্ডা আর রসালাপ। তারপরই পাক্কি চড়ে সোজা কোন না কোন উপপত্বীর কোলে নিজেকে সঁপে দেওয়া।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে মাঝরাত্তির গড়িয়ে যায়। ঘুম আর ক্লান্তিতে ঢুলতে ঢুলতে ঘরে ঢুকেই বিছানায় লুটিয়ে পড়েন।

বসাক মশাই বলেন, তোমরাই বলো, ছোট বউয়ের সঙ্গে ন্যাকামী বা ঢলাঢলি করার সময় কোথায় আমার?

দু'তিনজন মাথা নেড়ে বলেন, হ্যা, ঠিকই বলেছেন।

নিত্যহরি ওদের সঙ্গে এক মত হতে পারলেন না। বলেন, কিন্তু বসাক মশাই, আপনার ছোট বউ তো বৃদ্ধা না, রোগগ্রস্তা না ; তিনিও যুবতী। তারও তো চাহিদা মেটাবার দায়িত্ব আপনার।

দেখো নিত্যহরি, ছোট বউকে যখন বিয়ে করি, তখন সে ষোড়শী প্রথম বছর খানেক প্রত্যেক সপ্তাহে দু'একদিন সে আমার সঙ্গে সহবাস করেছে। সত্যি কথা বলতে কি বছর খানেক পরই ওর দেহে যৌবনের ঢল নামলো আমি উপপত্বীদের কাছ থেকে ফিরে আসার পরও ওকে সোহাগ না করে ঘুমুতে পারতাম না।

নিত্যহরি প্রশ্ন করেন, তারপর কি নেশা কেটে গেল?

প্রশ্ন শুনে অঘোর বসাক বেশ বিরক্ত হয়েই বলেন, দেখো নিত্যহরি, বিয়ে করা বউদের ন্যাকামীতে আমার নেশা ধরে না।

কেন?

আরে দূর! দূর! ওরা পুরুষদের খুশি করতেই জানে না।

বসাক মশাই মুহূর্তের জন্য থেমে একটু হেসে বলেন, পুরুষদের খুশি কবার জন্য উপপত্বীরা যে কত রকমের ছলা-কলা-ঢং জানে, তা তুমি ভাবতে পারবে না। ওরা সত্যি পুরুষদের নেশা ধরিয়ে দেয়।

সবাই চুপ।

বসাক মশাই আবার হাসতে হাসতে বলেন, ওরে বাপু, বিয়ে করা বউদের চাইতে উপপত্বী বা রক্ষিতাদের কাছে অনেক বেশি আনন্দ পাওয়া যায় বলেই তো সমাজের সব গণা-মান্য বিস্তবানরা একাধিক উপপত্ী বা রক্ষিতা বাখেন।

উনি নিত্যহরির থুতনী ধরে বলেন, ওহে দু'একটা রক্ষিতা রাখো। দেহে-মনে অনস্ত বসন্ত বিরাজ করবে।

রক্ষিতা পোষা তো অনেক খরচের ব্যাপার।

খত

নিশ্চয়ই খরচের ব্যাপার। শুধু ভাত-কাপড় দিয়ে বউ পোষা যায় ; রক্ষিতা রাখা যায় না। তেমন ভাল রক্ষিতা পোষা আর হাতি পোষা একই ব্যাপার কিন্তু যে মধু, যে রস, যে আনন্দ উপভোগ করা যায়, তা কোন বিয়ে করা বউয়ের কাছে কোনকালে কেউ পায়নি।

হাসতে হাসতে অঘোর বসাক আবার তাকিয়ায় হেলান দেন। নিত্যহরি সঙ্গে সঙ্গে বলেন, আপনি আসল কথাটাই তো বললেন না।

কোন কথা?

আপনি উপপত্বী নিয়ে মহাসুখে দিন কাটাচ্ছেন কিন্তু ছোট বউ কিভাবে.....

ওকে কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বসাক মশাই বেশ গম্ভীর হয়ে বলেন, কেন, ব্রজ তো আছে।

কে ব্রজ?

আমার মেজ পিসিমার সেজ ছেলের খুড়তুতে' শালার দূর সম্পর্কের আত্মীয়। অতীব দরিদ্র পরিবারের ছেলে। বাড়িতে খাওয়া-পরার কষ্ট পাচ্ছিল। তাই ওকে নিয়ে এসে বাড়িতে রেখে দিলাম।

গরীবের ছেলেকে বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছেন, সে তো ভাল কথা কিন্তু করে কি?

ছোট বউয়ের ফাই-ফরমায়েস খাটে ওর কথা মতো আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি যায় খোঁজ খবর নিতে-দিতে ; ময়রার দোকান থেকে মিষ্টি এনে দেয়। আবার কখনও স্যাকরাকে খবর দেয়, ছোট বউয়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য।

এতেই ছোট বউ খুশি?

বলরাম মুখুজ্যে প্রন্ম করেন, ছোকরার বয়স কত?

বসাক মশাই বলেন, ভাল-মন্দ খেয়েদেয়ে আঠারো বছরের ব্রজ এখন তাগড়া জোয়ান।

উনি ঠোটের কোণে হাসি চেপে পাত্র-মিত্রদের বলেন, ব্রজ এখন ছোট বউয়ের বড় পেয়ারের পাত্র

সবার মুখেই চাপা হাসি।

বসাক মশাই চাপা হাসি হাসতে হাসতেই বলেন, ওহে নিত্যহরি, বাড়িতে একটা ব্রজ আমদানী করো। দেখবে বউরা আর মারামারি কাটাকাটি করছে না।

তিন

নকু সরকার ছিলেন মিঃ পার্কারের 'মুলী'। তবে সাহেবরা মুন্সীকেই বলতো সরকার। তাইতো সবার কাছে নকু দত্ত পরিচিত হলেন নকু সরকার বলে।

নকু দত্ত'র আসল নাম ছিল নিকুঞ্জ দত্ত। মিঃ পার্কার আর মেমসাহেব বেশ কয়েক মাস চেষ্টা করেও নিকুঞ্জ উচ্চারণ করতে পারলেন না। অথচ বাড়ির সরকারকে তো মিঃ দত্ত বলা যায় না। এত সম্মান পাবার উপযুক্ত সে না।

নিকুপ্জ প্রথমে হলেন নিকু ; তারপর নকু।

পার্কার সাহেব তখন শুধু কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারী না, বিখ্যাত ব্যবসাদারও। আয় করেন দু'হাতে না, দশ হাতে। তা না হলে চৌরঙ্গীর অত বড় কুঠীতে বাস করা ছাড়াও অত কর্মচারী রাখতে পারেন? খানসামা, খিদমদগার, বাবুটি, দ্বারোয়ান, হরকরা, কচুয়ান, সহিস, মশালচি, সর্দার বেয়ারা, সহকারী বেয়ারা, পাংখা বেয়ারা, মেথর, ভিত্তি আবদার। এদের উপরে সরকার।

শুরুতেই নকু দত্ত'র মাইনে হলো কুড়ি টাকা।

কুড়ি টাকা?

শুনেই মাথা ঘুরে যায় আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধব প্রতিবেশীদের

শুধু কি মাইনে?

সাহেব-মেমসাহেবের সব কেনাকাটায় টাকায় দু'আনা দস্তবরি।

অর্থাৎ সাড়ে বারে পার্সেন্ট !

চাল-ডাল-নুন-তেল, পাঠার মাংস-গরুর মাংস-শুয়োরের মাংস-মুরগির মাংস, পরার জন্য নেটের টেপ, মোজা-জুতা ইত্যাদি থেকে চেয়ার-টেবিল-আলমারি- পালক্ক ছাড়াও আরো কত কি কেনা হতো সাহেব-মেমসাহেবের হুকুম মতো। এই সবকিছু কেনাকাটায় সাড়ে বারো পার্সেন্ট !

আঃ! নকু সরকার আনন্দে ধেই ধেই করে নাচে।

কলকাতায় বছরখানেক থাকার পরই মিসেস পার্কার প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়েন। শেষ পর্যন্ত কোম্পানির ডাক্তারের পরামর্শে মেমসাহেকে বিলেতে পাঠিয়ে দিলেন মিঃ পার্কার।

পার্কার সাহেব মহা চিন্তায় পড়লেন, রাত কাটবে কিভাবে? নিজের দেশ, নিজের

সমাজ, নিজের স্ত্রীকে ছেড়ে এত দূর দেশে কি একলা একলা রাত কাটানো যায়? অসম্ভব।

কয়েকদিন পরই খবর পেলেন পার্কার সাহেবের প্রিয় বন্ধু মুর্শিদাবাদের রেসিডেন্ট মিঃ সেটান। উনি সঙ্গে সঙ্গে চিঠি লিখলেন প্রিয় বন্ধুকে।

ডিয়ার হ্যারল্ড, তুমি বোকা বলেই এদেশে স্ত্রীকে এনেছিলে। আমাদের দেশের কোন মেয়েই এখানে সুস্থ থাকতে পারে না। আবার অসুস্থ হলে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করাও যায় না দেশে। কোম্পানির দু একজন ডাক্তার ছাড়া এখানে আর কোন ডাক্তার নেই। যাইহোক তুমি স্ত্রীকে দেশে পাঠিয়ে সত্যি বুদ্ধিমানের পরিচয় দিয়েছ।....

...এদেশে আমাদের মত ইংরেজদের সঙ্গে রাত কাটাতে উৎসুক মেয়ে আছে হাজার হাজার। আমি নিজে আমার আনন্দের জনা আমার কুঠীতে পনের-যোলটি মাগীকে রেখেছি। আমি এক একদিন এক একটি বা দুটি মাগীকে নিয়ে রাত কাটাই এবং আমি হলপ করে বলছি, এইসব মাগীদের সঙ্গে রাত কাটিয়ে আমি সত্যি আনন্দিত হই এছাড়া নবাব বাড়ি থেকে মাঝে মাঝে আমার আনন্দের জন্য দু" একটি সুন্দরী যুবতীও পাঠানো হয়। দু'তিন রাত উপভোগের পর আমি ওদের আবার নবাব বাড়িতে পাঠিয়ে দিই।

যাইহোক গতকালই আমার কুঠীতে তিন-চারটে নতুন মেয়ে এসেছে। আমি তোমার আনন্দের জন্য দুটি মাগীকে পাঠাতে চাই। এখানকার কোন কর্মচারীকে আমি বিশ্বাস করি না। তুমি সত্বর তোমার একজন বিশ্বস্ত কর্মচারীকে এখানে পাঠাও। সে এখানে দু'জনকে পছন্দ করবে, আমি আমার নৌকা করে তোমার কর্মচারী মেয়েদের তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব।

আমার একান্ত বিশ্বাস, এই মেয়েদের উপভোগ করে তুমি আনন্দেই থাকবে...

জী সাহেব!

সর্দার: নকুকে জলদি বুলাও!

নকু সরকার ছুটে এসেই সেলাম দিয়ে বলেন, সার, ইওর মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সারভেন্ট হাজির।

নকু, রিড দিস লেটার। চটপট চিঠিটা পড়ো।

সাহেবের হাত থেকে চাবিটা নিয়েই নকুর মুখ শুকনো হয়ে যায়। বলে, সার, লেটার ইংলিশ! স্লো! স্লো!

ঠিক হ্যায়!

চিঠিটার উপর দিয়ে চোখ বুলাতে বুলাতে নকু সরকার গার্লস, বিউটিফুল, নাইট. এনজয়মেন্ট ইত্যাদি শব্দ দেখেই এক গাল হেসে বলে, ভেরি ভেরি গুড লেটার। ভেরি হ্যাপি লেটার।

নকু!

ইয়েস হাজির!

তুমি কাল সকালেই মুর্শিদাবাদ স্টার্ট করো আমার চিঠি নিয়ে আমার বন্ধুর সঙ্গে দেখা করবে। তারপর ওখানে দু'তিন দিন থেকে ভাল করে দেখেশুনে দুটো সুন্দরী মাগীকে নিয়ে আসতে পারবে?

ইয়েস, ইয়েস, সী গার্লস, ব্রিংগ টু।

দ্যাটস রাইট।

পার্কার সাহেব সঙ্গে সঙ্গে বলেন, তুমি ছাড়া অন) কোন কর্মচারীকে বিশ্বাস করি না বলেই তোমাকে মুর্শিদাবাদ পাঠাচ্ছি। তবে হ্যা, যদি আজেবাজে মাগীকে পছন্দ করে আনো, তাহলে আমি তোমাকে লাথি মেরে দূর করে দেব।

নকু এক গাল হেসে বলে, ভেরি, গুড সার!

মিঃ স্টোন বন্ধুর চিঠি পড়েই একজন কর্মচারীকে হুকুম করলেন, সরকারকে গেস্ট হাউসে নিয়ে যাও। ওখানকার কর্মচারীদের বলে দিও, ওনার যেন কোন কষ্ট বা অসুবিধা না হয়।

জী হুজুর।

এখন তো উনি বিশ্রাম করবেন। তাই সন্ধের পর ওনাকে যেন জেনানা মহলে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর উনি কয়েকজনকে নিয়ে গেস্ট হাউসে য'বেন।

জী হুজুর।

এবার মিঃ স্টোন নকু সরকারকে বলেন, আপনি দুতিন দিন মেয়েদের ভাল করে দেখে, কথা বার্তা বলে যে দু'জন মেয়েকে আপনার মনে হবে, আমার বন্ধুর পছন্দ হবে, তাদের নিয়ে যাবার ব্যবস্থা আমি করব।

সার, ইউ ভেরি গুড! ভেরি ভেরি কাইন্ড!

ইয়েস, গো!

গেস্ট হাউস দেখে তো নকু সরকারের চোখ ছানাবড়া ঘর দেখেই ওর মনে

১৭

হয়, এটা নিশ্চয়ই নবাব সিরাজদ্দৌলার ঘর ছিল। তা না হলে এত সাজানো-গুছানো হয়?

জনাব, সরবত !

নকু সরকার সরবত খাবে কি! যে মেয়েটি সরবত দিতে এসেছে, তাকে দেখেই মন-প্রাণ জুড়িয়ে যায়।

নকু এক গাল হেসে বলে, তোমার নাম কি?

সেলিনা।

বাঃ! খুব সুন্দর নাম।

সেলিনা শ্বেত পাথরের টেবিলের উপর সরবতের গেলাস রাখতেই নকু বলে, তুমি আবার কখন আসবে?

আপনি যখন হুকুম করবেন, আমি তখনই আসব।

মুহূর্তের জন্য থেমে বলে, আপনার যাতে কোন কষ্ট না হয়, তা আমি দেখব। আপনি যা হুকুম করবেন, আমি তাই করব।

নকু ডান হাত দিয়ে ওর গাল টিপে এক গাল হেসে বলে, আমি যা বলব, তাই করবে?

জরুর করব। আপনি সাহেবের মেহেমান মাছেন। আপনার সেবা-যত্ব করা, আপনার হুকুম তামিল করার জন্যই তো আমি আছি।

খুব ভাল, খুব ভাল। কিন্ত আমি তোমাকে ডাকব কি কবে?

আমি তো জালির ওপাশেই থাকব। আপনি হাতে একটু তালি দিলেই আমি হাজির হবো।

আমি সরবত খেয়ে হাত-মুখ-ধুয়ে আসি। তারপর তুমি আমার একটু সেবা করবে।

জী হুজুর।

সেলিন সঙ্গে সঙ্গেই প্রম্ন করে, আপনি কি বিকেলেব দিকে কোথাও বেড়াতে যাবেন?

না।

আপনি সন্ধের সময তো জেনানা মহলে যাবেন?

হ্যা।

নকু সঙ্গে সঙ্গে বলে, তুমি জানো কেন আমি জেনানা মহুলে যাব?

আপনি পছন্দ করে দুটো লেড়কী নিয়ে যাবেন সাহেবের দোত্তের জন্য।

দেখছি, তুমি সবহ জানো।

২৮

জেনানা মহলের সব লেড়কীই সুন্দর।

নকু আবার সেলিনার গাল টিপে বলেন, তোমার মত সুন্দর তো ওরা হবে না.

একটু সলজ্জ হাসি হেসে বলে, আমি আবার সুন্দর নাকি?

আমি অন্তত তোমার চাইতে সুন্দর মেয়ে দেখিনি। তুমি ভারী সুন্দর। ভারী মিষ্টি মেয়ে।

আপনি শরবত খেয়ে হাত-মুখ ধুয়ে এসে আমাকে ডাকবেন। আমি আপনার সেবা করব।

হ্যা, নকু সরকার হাত-মুখ ধুয়ে এসে তালি বাজাতেই সেলিনা এসে হাজির হয়। বলে, হুজুর, আপনি গুয়ে পড়ুন। আমি আপনার সেবা করছি।

সেলিনা ওর নরম হাত দিয়ে গা-হাত-পা টিপে দিতেই নকু সরকারের সব ক্লান্তি যেন দূর হয়ে যায়। চোখ বুজে আসে। চোখ বন্ধ করেই বলে, সেলিনা, সত্যি খুব ভাল লাগছে।

আপনার ভাল লাগছে গুনে আমারও ভাল লাগছে।

রাত্তিরে তুমি কি আমার কাছে থাকবে?

আপনি হ্ুকুম করলে জরুর থাকব।

সেলিনা মুহুর্তের জনা থেমে বলে, আপনাদের মত মেহেমানদের খুশি করার জন্য এখানে আরো েড়কী আছে। আপনি তাদেরও কাউকে পছন্দ করলে, সেও রাত্রে আপনার কাছে থাকবে।

না, না, অন্য কেউ না; তুমিই আমার কাছে থাকবে। তুমি আমার কাছে থাকলে আমি খুব খুশি হবো।

আমিও আপনাকে খুশি করার চেষ্টা করব।

সেলিনাকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে একটু আদর কবে নকু সবকার বলে. এখন তুমি বিশ্রাম করতে যাও। আমি জেনানা মহল (থেকে ঘুরে এলে তোমাকে ডাকব।

নকু সরকার জেনানা মহলে পৌঁছতেই একজন বয়স্কা মহিলা ওকে অভ্যর্থনা জানায়, আদাব। হুজুর (ভিতরে চলুন।

পাশের একটা ঘবে.নকু সরকারকে বসতে দিয়েই & মৃহিলা বলেন, হুজব, আমার এখানে এখন উনিশটি মেয়ে আছে। সবাই সুন্দরী, সবাই যুবতা। আপনি এদের সবাইকে দেখুন। ভারপব অ'পনাব পছন্দমতো কয়েকজনকে পরীক্ষা করে দেখে...

২৯

নকু সরকার ওর কথার মাঝখানেই একটু চিন্তিত হয়ে বলে, পার্কার সাহেব আমাকে হুকুম করেছেন, মেয়েদের শরীর খুব ভাল করে দেখতে ; মেয়েদের যেন কোন ইস্কিন রোগ না থাকে।

হ্যা, হ্যা, বুঝেছি।

এঁ মহিলা গম্ভীর হয়ে বলেন, কোন অত্যন্ত সুন্দরী মেয়ের শরীরের কোথাও যদি সামান্য চুলকানিও থাকে, তাহলে সাহেবরা তাকে একবার ছুঁয়েও দেখবে না।

ইয়েস, ইয়েস, ঠিক বলেছেন।

আগে আপনি সব মেয়েদের দেখুন। আমাকে বলবেন, কোন মেয়েদের আপনি পরীক্ষা করে দেখতে চান। তারপর আপনাকে একটা ঘরে বসিয়ে আমি একটি করে মেয়ে পাঠাব।

হ্যা, ঠিক আছে। আমি ওদের দেখব, কথাবার্তা বলব কিন্তু সারা শরীর পরীক্ষা করে দেখতে পারব না।

মহিলা একটু হেসে বলেন, কেন লজ্জা করবে?

হ্যা, লজ্জা তো করবেই। আমার দ্বারা ওকাজ হবে না।

নকু সরকার সঙ্গে সঙ্গে বলে, ওদের শরীর-টরির আপনিই পরীক্ষা করে দেখবেন কারুর কোন ইস্কিন রোগ আছে কিনা।

আপনি যখন বলছেন, তখন আমিই দেখব।

জেনানা মহলের মেয়েদের দেখে নকু সরকারের মাথা ঘুরে যায়। সবাই এক একজন অন্দরী। এদের মধ্যে কাদের পছন্দ করবেন আর কাদের বাতিল করবেন, তা ভেবে কুলকিনারা পায় না নকু সরকার। তবু চার-পাঁচজনকে নকু আলাপ করে দেখে। টুকটাক কথাবার্তা বলে। একটু-আধটু গায় হাত দিয়েও দেখে।

তারপর বয়স্কাকে বলে, বুঝতেই তো পারছেন সাহেবের ব্যাপার। আপনি যে দু'জনকে পছন্দ করবেন, আমি তাদেরই কলকাতায় নিয়ে যাবো।

ঠিক আছে, আমি পছন্দ করব কিন্তু আপনিও ওদের সঙ্গে দুটো রাত কাটিয়ে

নকু সরকার জিভ কামড়ে বলে, ইস! তাই কি সম্ভব?

কেন?

সাহেব যাদের নিয়ে রাত কাটাবেন, আমি কি তাদের সঙ্গে রাত কাটাতে পারি?

বয়স্কা মহিলা একট্র হেসে বলেন, দেখছি, আপনি নিতান্তই সাধুপুরুষ।

উনি মুহূর্তের জন্য থেমেই ভাবার বলেন, রাত না কাট'লেও ওদের সঙ্গে দু'এক ঘণ্টা কথাবার্তা বলবেন।

৩০

তা বলতে পারি।

আজ রাত্রে কি একজনকে পাঠাব?

না, না, আজ না ; কাল বিকেল-সন্ধের দিকে পাঠাবেন। ঠিক আছে, তাই পাঠাব।

রাত্রের খাওয়া-দাওয়া সেরে নকু সরকার চাদের আলোর গঙ্গার শোভা দেখছিলেন আর মনে মনে ভাবছিলেন সারাদিনের কথা কোম্পানির সাহেবরা কি স্ফুর্তিতেই দিন কাটাচ্ছে! বোধহয় রাজা-বাদশারাও এত সুখে আনন্দে দিন কাটান নি।

হুজুর, আমি হাজির।

নকু সরকার ঘুরে দীড়িয়ে সেলিনাকে অপূর্ব সুন্দর জালি কাপড়ের পোশাক পরা দেখেই ওকে জড়িয়ে ধরে।

হুজুর, জেনানা মহলের কোন লেড়কী কি রাত্রে আপনার কাছে থাকবে

না, না, আমি বারণ করেছি। তুমি আমার কাছে সারারাত থাকবে।

জরুর থাকব।

চলো, ঘরে যাই। আগে তোমার সঙ্গে একটু গল্প করি।

চলুন।

ঘরে এসে নকু সেলিনাকে নিবিড়ভাবে কাছে টেনে নিয়ে প্রশ্ন করে, তুমি যেমন আমার সেবা-যত্বের জন্য রয়েছ, অন্য অতিথিদের জন্যও কি অন্য মেয়েরা আছে?

হ্যা, হুজুর, সব অতিথিদের জন্যই এইরকম ব্যবস্থা আছে।

যদি কোন মেয়ে অতিথি আসে?

হ্যা, তাদের জন্যও কয়েকটা লেড়কা আছে।

নকু অবাক হয়ে বলে, ছেলেরা মেয়ে অতিথিদের সেবা-যত্বু করে?

হ্যা, করবে না কেন?

সেলিনা মুহূর্তের জন্য থেমে বলে, কোম্পানির এক বড় সাহেবের মেয়ে এসেছেন বেড়াতে এখানেই আছেন। তাকে তো সফী সেবা-যত্ব করছে এক সপ্তাহ ধরে।

বলো কি?

হুজুর, অবাক হচ্ছেন কেন?

না থেমেই বলে, আমি যদি আপনার সেবা করতে পারি, তাহলে সফী মেমসাহেবের সেবা করবে না কেন?

৩১

হ্যা, তা' ঠিক কিন্তু...

সেলিনা একটু হেসে বলে, মেমসাহেব তো সফীকে নিয়ে তিন রাত নৌকা- বিহার করে এলেন। সফীকে মেমসাহেবের খুব পছন্দ।

নকু সরকার মনে মনে ভাবে, তো দেখছি স্বর্গরাজ্য !

দু" এক মিনিট চুপ করে থাকার পর নকু বলে, আচ্ছা সেলিনা, কোম্পানির সাহেবরাই কি অতিথিদের সেবা-যত্তের জন্য এইসব ছেলে-মেয়ের ব্যবস্থা চালু করেছে?

না, হুজুর ; নবাবের আমলের বিধিব্যবস্থাই কোম্পানির সাহেবরা চালু রেখেছে!

যাইহোক সেলিনাকে নিয়ে তিন রাত্তির স্ব্গসুখ উপভোগের পর নকু সরকার দুটি পরমা সুন্দরী যুবতী মাগীকে নিয়ে কলকাতা যাত্রা করে।

পার্কার সাহেব দুটি মাগীকে নিয়ে এক রাত কাটিয়েই মহানন্দে ঘোষণা করেন, নকু, দুটো মাগীই অসাধারণ আয়াম ভেরি হ্যাপি। আমি তোমাকে পুরস্কার দিবে।

সার, ইওর মোস্ট ওবিডেয়েন্ট সার্ভেন্ট ভেরি হ্যাপি!

মিঃ পার্কার তখন কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছাড়াও দু'টি বাবসা করতেন। এক-ফোর্ট উইলিয়ামের সেনাদের সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরবরাহ করা ; অন্য ব্যবসা ছিল বিলেতগামী জাহাজ গুলিতে সব রকমের খাদ্যদ্রব্য অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সরবরাহ করা।

ইউ ব্রাডি নকু!

সার, ইওর ব্লাডি নকু হাজির।

এবার থেকে জাহাজের সব সাপ্লাই তুমি দেবে।

আমি' মাই কান নো বিশ্বাস। প্রভু, সত্যি বলছি, নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছি না।

ইয়েস নকু, জাহাজের সাপ্লাই ব্যবসা তোমাকে দিয়ে দিলাম।

নকু সবকাব আনন্দে কৃতজ্ঞতায় পার্কাবের পায লুটিয়ে পড়ে বলে, গড জেসাস শুড ইউ আমি বলছি ভগবান যীশু আপনার নিশ্চয়ই ভাল করবেন।

দ্যাটস রাইট: এখন পা ছাড়ো।

নকু সবকাব আনন্দে খুশিতে প্রায় ধেই ধেই করে নাচতে নাচতে বাছি মায় কিন্তু কাউকে: কিছু বলে না। খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়ে। এবটু পৰে স্ত্রী পাশে এসে শুতেই চোজাজ বিগাড়ে যায প্লে, একটু সরে শোও।

আজ আপনার হলে। বি? অন্য দিন তো...

৩২

আঃ! বাজে বকো না।

সেলিনাকে নিয়ে তিন রাত্তির স্বর্গসুখ উপভোগের পর এই স্ত্রীর পাশে শুতেও ঘেন্না করে নকু সরকারের অনেক রাত পর্যন্ত শুধু সেলিনার কথাই চিস্তা করে।

নকু মনে মনে ঠিক করে, যেভাবেই হোক আবার সেলিনার কাছে যেতেই হবে।

পরের দিন সকালে সাহেবের সঙ্গে দেখা হতেই নকু হাত কচলে বলে, সার, ইওর মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সার্ভেন্টের একটা নিবেদন আছে।

ইয়েস নকু টেল মী।

মুর্শিদাবাদের দুটো মাগীকে পেয়ে আপনি যখন খুবই খুশি হয়েছেন, তখন স্টোন সাহেবকে আপনার কিছু উপহার পাঠানো উচিত।

দ্যাটস রাইট নকু! তুমি ঠিক বলেছ।

আপনি হুকুম দিলে আমি মুর্শিদাবাদে গিয়ে আপনার উপহার স্টোন সাহেবকে দিয়ে আসতে পারি।

হ্যা, হ্যা, তুমিই যাবে ; আবার কাকে পাঠাব।

মিঃ পার্কার দু'এক মিনিট পর বলেন, আমি নিজে দু'একদিনের মধ্যে উপহারগুলো কিনব। তারপর তুমি মুর্শিদাবাদ যাবে।

সার, জেনানা মহলের যে হেড মাগী আপনার মাগীদের প্রথম পছন্দ করে, তাকেও কিছু...

ওকে কিছু টাকা দিয়ে দিও।

সাহেব, আরো একটা নিবেদন আছে।

আবার কি নিবেদন?

সাহেব, মুর্শিদাবাদে অনেক কিছু দেখার আছে। গতবার তো ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম; কিছুই দেখার সময় পাইনি। এবার...

অলরাইট! তুমি ওখানে এক উইক বা দশদিন থেকো আমি স্টোনকে লিখে দেব তোমার সব ব্যবস্থা করার জন্য।

সাহেব, আপনি ভেরি গুড।

লুক হিয়ার নকু, তুমি মুর্শিদাবাদ থেকে ফিরে এসেই জাহাজের সাপ্লাই ব্যবসা শুরু করবে।

প্রভু, আই নো মানি। ব্যবসা করার মত টাকা আমার নেই।

আই উইল গিভ ইউ মানি। তারপর তোমার টাকা হলে আমাকে ফেরত দিয়ে দেবে।

সার, ভেরি গুড: ভেরি গুড!

৩৩

সুর্যোদয়-__৩

যাইহোক কালে কালে এই নকু সরকার কোম্পানির নানা সাহেবদের কৃপায় বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা-বাণিজ্য করে প্রসৃত অর্থ বিপুল সম্পত্তির মালিক হন। শুধু তাই না। ইনি কলকাতা শহরের একজন গণ্যমান্য ব্যক্তি বলেও সম্মানিত হতেন। ইনি লাটসাহেবের বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে যেতেন ; আবার লাটসাহেবও নকু সরকারের বেলগাছিয়ার বাগান বাড়িতে কাশীর বিখ্যাত বাঈজী জাহানারার নাচ দেখতে" আসতেন। রাজা রাধাকান্ত দেব পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুর পরিবারের সঙ্গেও ইনি নিত্য ওঠা-বসা করতেন। তবে অনেকে নকু সরকারের মুখদর্শন করতেও ঘেন্নাবোধ করতেন।

নকু সরকারের বসবাসের জন্য আহিরীটোলায় যে বিশাল প্রাসাদ তৈরি করেন, তার প্রবেশপথে পাথরের ফলকে লেখা আছে “দত্ত ভিলা" কিন্তু আবাল-ৃদ্ব-বনিতা বলে নকু সরকারের বাড়ি।

নকু সরকার অত্যন্ত বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। দশ-বারোটি রক্ষিতা রাখলেও বিবাহিতা স্ত্রী ছিল একজনই। এই স্ত্রীর গর্ভে তার দুটি পুত্রের জন্ম হয়; তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হচ্ছেন অনুকৃলচন্দ্র কনিষ্ঠ হচ্ছেন নকুলচন্দ্র। অনুকূল বসবাস করেন আহিরীটোলার দত্ত ভিলায় ; নকুল চন্দ্র বসবাস করেন বিডন স্ট্রাটের নিকুঞ্জ ভিলায়। আলাদা বাড়িতে বসবাস করলেও যৌথ পরিচালনায় শুধু পৈতৃক ব্যবসা- বাণিজ্যই না, আরো অনেক নতুন ব্যবসা অত্যন্ত ভালভাবেই চলছে।

ওরা দু'জনেই সুখে-শান্তিতে সংসারজীবন যাপন করছেন। তবে হ্যা, দু'জনেরই রক্ষিতা আছে। দু'ভাইয়ের সুখ-আনন্দ দু'রকমের। অনুকৃলচন্দ্রের দত্ত ভিলায রোজ সন্ধাকালীন একটা আসর বসতো। সে আসরে নানা ধরনের মানুষ আসতেন ; আলাপ-আলোচনাও হতো বিচিত্র বিষয়ে। এই আসরের পর বৌবাজারের বাঈজী বাড়িতে নাচ দেখে অনুকূলচন্দ্র যেতেন রক্ষিতার কাছে। নকুলচন্দ্রের সখ ছিল কোম্পানির সাহেবদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে মদ্যপান করা মাঝে-মধ্যে শিকারে যাওয়া।

অন্যান্য দিনের মত সেদিনও অনুকূলচন্দ্রের আসরে নানাজনের আগমন হয়েছে। আলোচনা হচ্ছে লাট সাহেবের নতুন প্রাসাদ নিয়ে।

একজন বলেন, শুনছি, ইংলন্ডেম্বর স্বয়ং ভারত সম্রাটের শ্রাসাদও বুঝি এত বিশাল না।

অনুকৃলচন্দ্র মৃদু হেসে বলেন, না, না; মহামান্য ইংলন্ডেশ্বরের বাকিংহাম আরো

৩৪

, অনেক বড়।

নগেন ঘোষ এক গাল হেসে বলেন, ভাই অনুকূল, এই প্রাসাদের যেদিন উদ্বোধন হয়, সেদিন নিশ্চয়ই তুমি আমন্ত্রিত ছিলে?

মহামান্য বড়লাট বাহাদুর লর্ড ওযেলসলি এই গত আঠার শ' দুই সালের চৌঠা মে এই প্রাসাদে প্রথম প্রবেশ করেন। সেদিন ওখানে শ্রীরঙ্গপত্তমের বিজয় উৎসব মহা সমারোহে উদযাপিত হয়।

নগেন ঘোষ ভুরু কুঁচকে প্রশ্ন করেন, শ্রীরঙ্গপত্তমে আবাব কি হয়েছিল?

অনুকুলচন্দ্র একটু হেসে বলেন, ওহে বন্ধুবর, টিপু সুলতানের পরাজয় মৃত্যুর জন্যই এঁ বিজয় উৎসব হয়।

তাই নাকি?

আজ্জে হ্যা।

উনি না থেমেই লেন, আমি এদিন না গেলেও মহামান্য ইং ক্ন্মদিনের উৎসবে যোগ দিতে প্রাসাদে প্রত্যেক বছরই যাই।

তুমি তো যাবেই।

নগেন ঘোষ হাসতে হাসতে বলেন, লাট সাহেবের বাড়িতে তো আর আমার মত চুনোপুটির নেমন্তন্ন হবে না।

ঠিক সেই সময় চক্কোত্তি মশায়ের প্রবেশ।

অনুকূলচন্দ্র তাকে সাদব অভ্যর্থনা জানান, আরে চক্বোন্তি মশাই, আসুন, আসুন।

চক্কোন্তি মশাই আসন গ্রহণ করতেই উনি বলেন, আপনার মত সৎ শাস্ত্রোজ্ঞ ব্রাহ্মণের দর্শন পাওয়াও তো ভাগ্যের কথা।

না, তা বলবেন না; তবে পিতা-পিতামহদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে স্মৃতিশাস্ত্ের চর্চা করেছি