২, বঙ্কিম চাটুজ্জে স্ব, কলিকাতা

প্রকাশক প্রীপুলিনবিহারী সেন বিশ্বভারতী, ৬।৩ ভ্বাবকা নাথ ঠাকুর লেন, কলিকাতা!

প্রথম সংক্করণ-_- ২৫ বৈশাখ, ১৩৪৭ দ্বিতীয় সংস্করণ-- কাতিক, ১৩৪৭ তৃতীয় সংস্করণ-- কাতিক, ১৩৪৮ চতুর্থ সংস্করণ-_ জ্যেষ্ঠ, ১৩৫

সুল্য ৫১, ৭৬৯ ৮২. ১৩.

মুদ্রাকর শ্রীগ্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় শান্তিনিকেতন প্রেস, শাস্তিনিকে তন

জর 8৩৪৩--6৫৩

চত্রসূচী কবিত। গান সোনার তরী নাটক প্রহসন চিত্রাঙ্গদা গোড়ায় গলদ উপন্যাস গল্প চোখের বালি প্রবন্ধ আত্মশক্কি গ্রন্থ-পরিচয় বর্ণানুক্রমিক সুচী

১৫৭ ১৬১

২৮৩

৫১৩ ৬৩৭ ১৪৯

যৌবনে রবীন্দ্রনাথ জ্যোষ্ঠা কন্তাসহ রবীন্দ্রনাথ সোনার তরীর পাগ্ুলিপির এক পৃষ্ঠা

রবীন্দ্রনাথ প্রিয়নাথ সেন রবীন্দ্রনাথ

৫২ ৯৬ ১৯৬১

কবি-ভ্রাত। শ্রীদেবেক্দ্রনাথ সেন মহাশয়ের করকমলে তদীয় ভক্তের এই গ্রীতি-উপহার সাদরে সমপিত হইল

সুচনা

জীবনের বিশেষ পর্বে কোনো বিশেষ প্রকৃতির কাব্য কোন্‌ উত্তেজনায় স্বাতন্ত্য নিয়ে দেখা দেয়, প্রশ্ন কবিকে জিজ্ঞাস করলে তাকে বিপন্ন কর! হয়। কী করে সে জানবে। প্রাণের প্রবৃদ্ধিতে যে-সব পরিবর্তন ঘটতে থাকে তার ভিতরকার রহস্য সহজে ধরা পড়ে না গাছের সব ডাল একই দিকে একই রকম করে ছড়ায় না, এদিকে ওদিকে তারা বেঁকেচুরে পাশ ফেরে, তার বৈজ্ঞানিক কারণ লুকিয়ে আছে আকাশে বাতাসে আলোকে মাটিতে গাছ যদি বা চিস্তা করতে পারত তবু ্্টিপ্রক্রিয়ার এই মন্ত্রণাসভায় সে জায়গ। পেত না, তার ভোট থাকত না, সে কেবল স্বীকার করে নেয়, এই তার স্বভাবসংগত. কাজ। বাইরে বসে আছে যে প্রাণবিজ্ঞানী সে বরঞ্চ অনেক খবর দিতে পারে

কিন্ত বাইরের লোক যদি তাদের পাঁওনার মূল্য নিয়েই সন্তষ্ট না থাকে, যদি জিজ্ঞাসা করে মালগুলেো৷ কেমন করে কোন্‌ ছাঁচে তৈরি হল, তাহলে কবির মধ্যে যে আত্মসন্ধানের হেড. আপিস আছে সেখানে একবার তাগাদা করে দেখতে হয়। বস্তত সোনার তরী তার নানা পণ্য নিয়ে কোন্‌ রপ্তানির ঘাট থেকে আমদানির ঘাটে এসে পৌঁছল ইতিপূর্বে কখনো প্রশ্ন নিজেকে করিনি, কেনন। এর উত্তর দেওয়া আমার কর্তব্যের অঙ্গ নয়। মূলধন যার হাতে সেই মহাজনকে জিজ্ঞাসা করলে সে কথা কয় না, আমি তো মাঝি, হাতের কাছে যা জোটে তাই কুড়িয়ে নিয়ে এসে পৌছিয়ে দিই।

মানসীর অধিকাংশ কবিতা লিখেছিলুম পশ্চিমের এক শহরের বাংলা-ঘরে। নতুনের স্পর্শ আমার মনের মধ্যে জাগিয়েছিল নতুন স্বাদের উত্তেজনা সেখানে অপরিচিতের নির্জন অবকাশে নতুন নতুন ছন্দের ষে বুনুনির কাঁজ করেছিলুম এর পূর্বে তা আর কখনো করিনি নৃতনত্বের মধ্যে অসীমত্ব আছে, তারি এসেছিল ডাক, মন দিয়েছিল সাড়া যা তার মধ্যে পূর্ব হতেই কুঁড়ির মতো শাখায় শাখায় লুকিয়ে ছিল, আলোতে তাই ফুটে উঠতে লাগল। কিন্তু সোনার তরীর লেখ৷

রবীন্দ্র-রচনাবলী

আর-এক পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের নদীতে নদীতে গ্রামে গ্রামে তখন ঘুরে বেড়াচ্ছি, এর নৃতনত্ব চলস্ত বৈচিত্রের নৃতনত্ব শুধু তাই নয়, পরিচয়ে-অপরিচয়ে মেলামেশা! করেছিল মনের মধ্যে বাংলাদেশকে তো বলতে পারিনে বেগানা দেশ, তার ভাষা চিনি তার সুর ছিনি। ক্ষণে ক্ষণে যতটুকু গোচরে এসেছিল তার চেয়ে অনেকখানি প্রবেশ করেছিল মনের অন্দরমহলে আপন বিচিত্র রূপ নিয়ে। সেই নিরন্তর জানাশোনার অভ্যর্থনা পাচ্ছিলুম অন্তঃকরণে, যে উদ্বোধন এনেছিল তা স্পষ্ট বোঝা যাবে ছোটে গল্পের নিরস্তর ধারায় সে-ধারা আজও থামত না! যদি সেই উৎসের তীরে থেকে যেতুম। যদি না টেনে আনত বীরভূমের শু প্রান্তরের কৃচ্ছসাধনের ক্ষেত্রে

আমি শীত গ্রীষ্ম বর্ধা মানিনি, কতবার সমস্ত বৎসর ধরে পদ্মার আতিথ্য নিয়েছি, বৈশাখের খররৌদ্রতাপে, শ্রাবণের মুষলধারা- বধণে। পরপারে ছিল ছায়াঘন পল্লীর শ্যঠামশ্রী, এপারে ছিল বালুচরের পাঙ্বর্ণ জনহীনতা, মাঝখানে পদ্মার চলমান আ্োতের পটে বুলিয়ে চলেছে ছ্যলোকের শিল্পী প্রহরে প্রহরে নানাবর্ণের আলোছায়ার তুলি। এইখানে নির্জন-স্জনের নিত্যসংগম চলেছিল আমার জীবনে অহরহ স্থখছুঃখের বাণী নিয়ে মানুষের জীবনধারার বিচিত্র কলরব এসে পৌছচ্ছিল আমার হৃদয়ে মানুষের পরিচয় খুব কাছে এসে আমার মনকে জাগিয়ে রেখেছিল। তাদের জন্য চিন্তা করেছি, কাজ করেছি, কর্তব্যের নানা সংকল্প বেঁধে তুলেছি, সেই সংকল্পের সুত্র আজও বিচ্ছিন্ন হয়নি আমার চিস্তাঁয়। সেই মানুষের সংস্পর্শে সাহিত্যের পথ এবং কর্মের পথ পাশাপাশি প্রসারিত হতে আরম্ভ হল আমার জীবনে আমার বুদ্ধি এবং কল্পনা এবং ইচ্ছাকে উন্মুখ করে তুলেছিল এই সময়কার প্রবর্তনা__ বিশ্বপ্রকৃতি এবং মানবলোকের মধ্যে নিত্যসচল অভিজ্ঞতার প্রবর্তন এই সময়কার প্রথম কাব্যের ফসল ভরা হয়েছিল সোনার তরীতে। তখনই সংশয় প্রকাশ করেছি, তরী নিঃশেষে আমার ফসল তুলে নেবে কিন্তু আমাকে নেবে কি।

যৌবনে রবীন্দ্রনাথ আন্তমানিক পঁচিশ বৎসর বয়সে

মোনাৰ তরী

সোনার তরী

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা কূলে এক] বসে আছি, নাহি ভরসা রাশি বাশি ভারা ভারা ধান কাট। হল সারা, ভরা নদী ক্ষুরধারা, থরশ্পরশা কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা

একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা, চারিদিকে বাকা জল করিছে খেলা পরপারে দেখি আকা তকুছায়ামসীমাখা গ্রামখানি মেঘে ঢাক! প্রভাতবেলা,--- এপারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা

গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে, দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে। ভরা-পালে চলে যায়, কোনে দিকে নাহি চায়,

শিলাইদহ, বোট ফাস্ধন, ১২৯৮

রবীন্দ্র-রচনাবলী

ঢেউগুলি নিরুপায় ভাঙে ছু-ধারে)- দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে

ওগো! তুমি কোথা যাও কোনু বিদেশে, বারেক ভিড়াও তরী কৃলেতে এসে | যেয়ো যেথা যেতে চাও, যারে খুশি তারে দাও শুধু তুমি নিয়ে যাও ক্ষণিক হেসে আমার সোনার ধান কূলেতে এসে

যত চাও তত লও তরণী 'পরে।

আর আছে ?--আর নাই, দিয়েছি ভরে এতকাল নদীকুলে যাহা লয়ে ছিন্থ ভুলে সকলি দিলাম তুলে থরে বিথরে, এখন আমারে লহ করুণা করে।

ঠাই নাই, ঠাই নাই,--ছোঁটে। সে তরী আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি শ্রাবণ-গগন ঘিরে ঘন মেঘ ঘুরে ফিবে, শৃন্ নদীর তীরে রহি্ন পড়ি, যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী

৩.২

সোনার তরী

বিশ্ববতী রূপকথা

সযত্বে সাজিল রানী, বাধিল কবরী, নবঘনঙ্গিখবর্ণ নব নীলাম্বরী পরিল অনেক সাধে তার পরে ধীরে গুপ্ত আবরণ খুলি আনিল 'বাহিবে মায়াময় কনকদর্পণ।। মন্ত্র পড়ি শুধাইল তারে-- কহ মোরে সত্য করি সর্বশ্রেষ্ঠ রূপসী কে ধরায় বিরাজে | : ফুটিয়া উঠিল ধীরে মুকুরের মাঝে মধুমাথা হাসি-আকা একখানি মুখ, দেখিয়া বিদারি গেল মহিষীর বুক-_ রাজকন্তা বিশ্ববতী সতিনের মেয়ে, ধরাতলে রূপসী সে সবাকার চেয়ে

তার পরদিন রানী প্রবালের হার পরিল গলায়। খুলি দিল কেশভার আজা্ুচুস্বিত। .গোলাপি অঞ্চলখানি, লজ্জার আভাস-লম, বক্ষে দিল টানি। স্বর্ণমুকুর রাখি কোলের উপরে শুধাইল মন্ত্র পড়ি-_ কহ সত্য করে ধরামাঝে সব চেয়ে কে আজি রূপসী দর্পণে উঠিল ফুটে সেই মুখশশী। কাপিয়! কহিল রানী, অগ্নিসম জ্বালা-_ পরালেম তারে আমি বিষফুলমালা, তবু মরিল না জলে সতিনের মেয়ে, ধরাতলে ব্ূপসী সে সকলের চেয়ে !

রবীজ্-রচনাবলী

তার পরদিনে,_ আবার রুধিল হবার শয়ন-মন্দিরে পরিল মুক্তার হার, ভালে সিন্দুরের টিপ, নয়নে কাজল, রক্তাম্বর পট্টবাস, সোনার আচল শুধাইল দর্পণেরে-- কহু সত্য করি ধরাতলে সব-চেয়ে কে আজি ুন্দরী উজ্জ্বল কনক-পটে ফুটিয়া উঠিল

সেই হাসিমাখা মুখ | হিংসায় লুটিল বানী শধ্যার উপরে কহিল কাদিয়া-_ বনে পাঠালেম তারে কঠিন বাধিয়া, এখনো সে মিল না সতিনের মেয়ে, ধরাতলে রূপসী সে সবাকার চেয়ে!

তার পরদিনে, আবার সাজিল স্থখে নব অলংকারে ; বিরচিল হাসিমুখে কবরী নৃতন ছাদে বাকাইয়া গ্রীবা, পরিল যতন করি নবরৌনব্রবিভা

নব পীতবাস দর্পণ সম্মুখে ধরে শুধাইল মগ্্র পড়ি-_ সত্য কহ মোরে ধামাঝে সব চেয়ে কে আজি বূপসী সেই হাসি সেই মুখ উঠিল বিকশি মোহন মুকুবে রানী কহিল জবলিয়া-_ বিষফল খাওয়ালেম তাহারে ছলিয়া, তবুও সে মবিল না সতিনের মেয়ে, ধরাতলে রূপসী সে সকলের চেয়ে !

তার পরদিনে বানী কনক-বরতনে খচিত করিল তন্ছ অনেক যতনে

ফাস্তন, ১২৯৮

সোনার তরী ১১

দর্পণেরে শুধাইল বনু দর্পভবে--

সর্বশ্রেষ্ঠ রূপ কার বল্‌ সতা করে।

দুইটি সুন্দর মুখ দেখা দিল হাসি; রাজপুত্র রাজকন্ দৌহে পাশাপাশি বিবাহের বেশে অঙ্গে অঙ্গে শিবা ঘত রানীরে দংশিল যেন বৃশ্চিকের মতে। | চীৎকারি কহিল রানী কর হানি বুকে-- মরিতে দেখেছি তাবে আপন সম্মুখে, কার প্রেমে বাচিল সে সতিনের মেয়ে, ধরাতলে ব্ূপী সে সকলের চেয়ে !

ঘষিতে লাগিল রানী কনক-মুকুর

বালু দিয়ে-_ প্রতিবিষ্ব না হইল দূর মসী লেপি দিল তবু ছবি ঢাকিল না। অগ্নি দিল তবুও তো! গলিল না সোনা আছাড়ি ফেলিল ভূমে প্রাণপণ বলে, ভাঙিল না সে মায়া-দর্পণ ভূমিতলে চকিতে পড়িল রানী, টুটি গেল প্রাণ-_- সর্বাঙ্গে হীরকমণি অগ্নির সমান

লাগিল জলিতে ভূমে পড়ি তারি পাশে কনকঘর্পণে ছুটি হাসিমুখ হাসে। বিশ্ববতী, মহিষীর সতিনের মেয়ে ধরাতলে রূপসী সে সকলের চেয়ে।

রং

রবীন্দ্র-রচনাবলী শৈশবসন্ধ্যা

ধীবে ধীরে বিস্তারিছে ঘেবি চাবিধার শ্রান্তি, আর শান্তি, আর সন্ধ্যা অন্ধকার, মায়ের অঞ্চলপম দাড়ায়ে একাকী মেলিয়া*পশ্চিমপানে অনিমেষ আখি

স্তব্ধ চেয়ে আছি আপনারে মগ্ন করি অতলের তলে, ধীরে লইতেছি ভরি জীবনের মাঝে-- আজিকার এই ছবি, জনশূন্য নদীতীর, অস্তমান রবি,

প্লান মৃছাঁতুর আলো-- বোদন-অরুণ, ক্লান্ত নয়নের যেন দৃষ্টি সকরুণ

স্থির বাক্যহীন,-- এই গভীর বিষাদ, জলে স্থলে চরাচরে শ্রাস্তি অবসাদ

সহসা উঠিল গাহি কোন্থান হতে বন-অন্ধকারঘন কোন্‌ গ্রামপথে

যেতে যেতে গৃহমুখে বালক-পথিক উচ্ছৃসিত ক্র নিশ্চিন্ত নির্ভীক কাপিছে সপ্তম স্বরে, তীব্র উচ্চতান সন্ধযারে কাটিয়! যেন করিবে দুখান দেখিতে না পাই তারে ওই যে সম্মুখে প্রাস্তরের সর্বপ্রান্তে, দক্ষিণের মুখে, আখের খেতের পাবে, কদলী স্থপারি নিবিড় বাশের বন, মাঝখানে তারি বিশ্রাম করিছে গ্রাম, হোখা আখি ধায় হোথা কোন্‌ গৃহপানে গেয়ে চলে ঘায় কোন্‌ রাখালের ছেলে, নাহি ভাবে কিছু, নাহি চায় শুম্তপানে, হি আগুপিছু

সোনার তরী ১৩

দেখে শুনে মনে পড়ে সেই সন্ধ্যাবেলা শৈশবের কত গল্প, কত.বালাখেলী, এক বিছানায় শুয়ে মোরা সঙ্গী তিন) সেকি আজিকার কথা, হল কত দিন। এখনো কি বুদ্ধ হয়ে যায়নি সংসার ভোলে নাই খেলাধুল!, নয়নে তাহার আসে নাই নিদ্রাবেশ শান্ত স্থশীতল, বালের খেলানাগুলি করিয়া বদল পায়নি কঠিন জ্ঞান ? দাড়ায়ে হেথায় নির্জন মাঠের মাঝে, নিজ্তন্ধ সন্ধ্যায়, শুনিয়া কাহার গান পড়ি গেল মনে কত শত নদীতীবে, কত আত্রবনে, কাংস্তঘণ্টা-মুখরিত মন্দিরের ধারে, কত শস্তক্ষেত্রপ্রান্তে, পুকুরের পাড়ে গৃহে গৃছে জাগিতেছে নব হাসিমুখ, নবীন হৃদয়ভর1 নব নব স্থখ,

কত অসম্ভব কথা, অপূর্ব কল্পনা,

কত অমূলক আশা, অশেষ কামনা, অনন্ত বিশ্বাস। দীড়াইয়া অন্ধকারে দেখিস নক্ষত্রালোকে, অসীম সংসারে রয়েছে পৃথিবী ভরি বালিক বালক, সন্ধ্যাশয্যা, মার মুখ, দীপের আলোক

ফাস্তন, ১২৯৮

রবীআ-রচনাঘলী

রাজার ছেলে রাজার মেয়ে

রূপকথ। প্রভাতে

রাজার ছেলে যেত পাঠশালায়,

রাজার মেয়ে যেত তথা দু-জনে দেখা! হত পথের মাঝে,

কে জানে কবেকার কথা৷ রাজার মেয়ে দূরে সরে যেত, চুলের ফুল তার পড়ে যেত, বাজার ছেলে এসে তুলে দিত

ফুলেব পাথে বনলতা।। রাজার ছেলে যেত পাঠশালায়,

রাজার মেয়ে যেত তথা পথের দুই পাশে ফুটেছে স্কুল,

পাখির! গান গাহে গাছে। রাজার মেয়ে আগে এগিয়ে চলে,

বাজার ছেলে যায় পাছে।

হু মধ্যান্ছে

উপরে বসে পড়ে রাজার মেয়ে, বাজার ছেলে নিচে বসে। পু'থি খুলিয়া শেখে কত কী ভাষা, খড়ি পাতিয়া আক কষে। বাজার মেয়ে পড়া যায় ভুলে, পুথিটি হাত হতে পড়ে খুলে,

সোনার তরী ১৫

রাজার ছেলে এসে দেয় তুলে, আবার পড়ে ধান খসে উপনে বসে পড়ে বাজার মেয়ে, বাজান ছেলে নিচে বসে ছুপুরে খবরভাপ, বকুলশাখে কোকিল কুহু কুহনিছে বাজান ছেলে চায় উপর পানে, বাজার মেয়ে চায় নিচে

সায়ানে,

বাজার ছেলে ঘরে ফিরিয়া আসে, ব্রাজান মেয়ে যায় ঘরে খুলিয়া গলা হতে মোতিব মালা সাজার মেয়ে খেলা করে। পথে সে মালাখানি গেল ভুলে, বাজার ছেলে সেটি নিল তুলে, আপন মণিহার মনোভূলে দিল সে বালিকার - করে।। বাজার ছেলে ঘবে ফিবিস্া এল, বাজার মেয়ে গেল ঘবে শ্রাস্ত সবি ধীবে অন্ভ যায় নঙ্দীর তীবে একশেষে সাজ হয়ে গেল গ্োহার পাঠ, যে যার গেল লিজ দেশে

১১

চৈত্র, ১২৯৮

রবীক্-রচনাবলী

পু ; নিশীথে

রাজার মেয়ে শোয় সোনার খাটে, হ্পনে দেখে বূপরাশি | রুপোর খাটে শুয়ে বাজার ছেলে দেখিছে কার স্থধা-হাঁসি কবিছে আনাগোনা স্থুখ-ছুখ, কখনো দুরু দুরু করে বুক, অধরে কভু কাপে হাসিটুক, নয়ন কতৃ যায় ভাসি। রাজার মেয়ে কার দেখিছে মুখ, বাজার ছেলে কার হাসি। বাদর ঝর ঝর, গরজে মেঘ, পবন করে মাতামাতি শিথানে মাথা রাখি বিথান বেশ, ্বপনে কেটে যায় রাতি।

নিদ্রিতা

রাজার ছেলে ফিরেছি দেশে দেশে সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার। যেখানে যত মধুর মুখ আছে " বাকি তো কিছু রাখিনি দেখিবার কেহ বা ডেকে কয়েছে ছুটে কথা, কেহ বা চেত্ে কযেছে আখি নত, কাহারে! হাসি ছুরির মতো কাঁটে কাহারো হাসি আখিজলেরি মতো

পা

সোনার তরী ১৭

গরবে কেহ গিয়েছে নিজ ঘর, কাঁদিয়া কেহ চেয়েছে ফিরে ফিরে কেহ বা কারে কহছেনি কোনো কথা, কেহ বা গান গেয়েছে ধীরে ধীরে এমনি করে ফিরেছি দেশে দেশে অনেক দুরে তেপাস্তর-শেষে ঘুমের দেশে ঘুমায় রাজবালা, তাহারি গলে এসেছি দিয়ে মাল।।

একদ! রাতে নবীন যে স্বপ্ন হতে উঠি চমকিয়া, বাহিরে এসে ্রাড়ানগ একবার ধরার পানে দেখিছু নিরখিয়! শীর্ণ হয়ে এসেছে শুকতারা, পূর্বতটে হতেছে নিশি ভোব। আকাশ-কোণে বিকাশে জাগরণ, ধরণীতলে ভাঙেনি ঘুমঘোর সমুখে পড়ে দীর্ঘ রাজপথ, ছু-ধারে তারি দাড়ায়ে তরুসার, নয়ন মেলি হৃদুরপানে চেয়ে আপন মনে ভাবিচ্গ একবার,-_- আমারি মতো! আজি নিশিশেষে ধরার মাঝে নৃতন কোন্‌ দেশে, ছুপ্ধফেনশম্বন করি আল! স্বপ্ন দেখে ঘুমায়ে রাজবালা

অশ্ব চড়ি তখনি বাহিরিনু কত যে দেশ-বিদেশ হু পার।

টি

রবীন্দ্-রচনাবলী

একদ। এক ধূসর সন্ধ্যায় ঘুমের দেশে লভিচ্থ পুরদ্বার সবাই সেথা অচল অচেতন, . কোথাও জেগে নাইকে। জনপ্রাণী, নদীর তীরে জলের কলতানে ঘুমায়ে আছে বিপুল পুরীখানি ফেলিতে পদ সাহস নাহি মানি, নিমেষে পাছে সকল দেশ জাগে। প্রাসাদ মাঝে পশিনু সাবধানে শঙ্কা মোর চলিল আগে আগে ঘুমায় রাজা, ঘুমায় রানীমাতা।, কুমার সাথে ঘুমায় রাজভ্রাতা ; একটি ঘরে বত্বদীপ জালা, ঘুমায়ে সেথা রয়েছে রাজবালা

কমলফুল-বিমল শেজখানি, নিলীন তাহে কোমল তচছছলতা মুখের পানে চাহিন্ু অনিমেষে বাজিল বুকে সুখের মতো বাথা। মেঘের মতো গুচ্ছ কেশরাশি শিথান ঢাকি পড়েছে ভাবে ভাবে একটি বাহু বক্ষ*পরে পড়ি, একটি বাহু লুটায় এক ধারে আচলখানি পড়েছে খসি পাশে, কাচলখানি পড়িবে বুঝি টুটি পত্রপুটে রয়েছে যেন ঢাক। অনাভ্রাত পূজার ফুল ছুটি দেখিস ভাবে উপমা নাহি জানি, ঘুমের দেশে প্ষপন একখানি,

শাস্তিনিকেতন ১৪ টজ্যেষ্ঠ, ১২৯৯

সোনার তরী ১৯

পালক্কেতে মগন রাজবাল। আপন ভরা-লাবণো নিরালা

ব্যাকুল বুকে চাপিনু ছুই বাহু, নামানেবাধা হদয়কম্পন ভূতলে বসি আনত করি শির মুদিত আখি করিন্থ চুম্বন। পাতার ফাকে আখির তারা ছুটি, তাহাৰি পানে চাহিল্গ একমনে, দ্বারের ফাকে দেখিতে চাহি যেন কী আছে কোথা নিভৃত নিকেতনে। ভূর্জপাতে কাজলমসী দিয়া লিখিয়! দি আপন নামধাম লিখিনু, “অয়ি নিদ্রানিমগনা, আমার প্রাণ তোমারে সপিলাম ।” যতন করি কনক-সুতে গাঁথি রতন-হারে বাধিয়! দিন পাতি ঘুমের দেশে॥ঘুমায় রাজবালা, তাহারি গলে পরায়ে দিচ্ছ মাল1।

সু্তোশ্খিতা

ঘুমের দেশে ভাঙিল ঘুম, উঠিল কলম্বর গাছের শাখে জাগিল পাখি

কুস্থমে মধুকর।

২০

রবীন্দ্র-রচনাবলী

অশ্বশালে জাগিল ঘোড়া হস্তিশালে হাতি মল্্শালে মল্প জাগি ফুলায় পুন ছাতি। জাগিল পথে প্রহরিদল, ছুয়ারে জাগে বারী, আকাশে চেয়ে নিরখে বেলা জাগিয়া নরনারী উঠিল জাগি রাজাধিরাজ, জাগিল বানীমাতা | কচালি আখি কুমার সাথে জাগিল রাজভ্রাতা। নিভৃত ঘরে ধূপের বাস, বতন-দীপ জালা, জাগিয়। উঠি শয্যাতলে শুধাল বরাজবালা-_ কে পরালে মাল1।

খসিয়া-পড়। আচলখানি বক্ষে তুলি দিল।

আপন-পানে নেহারি চেয়ে শবরমে শিহরিল

ত্রস্ত হয়ে চকিত চোখে চাহিল চারিদিকে,

বিজন গৃহ, রতন-দীপ জলিছে অনিমিথে।

গলার মালা খুলিয়া লয়ে ধরিয়া ছুটি করে

সোনার তরী ২১

সোনার স্থতে যতনে গাথা লিখনখানি পড়ে। পড়িল নাম, পড়িল ধাম, পড়িল লিপি তার, কোলের "পরে বিছায়ে দিয়ে পড়িল শতবার শয়নশেষে রহিল বসে ভাবিল রাজবালা-_- আপন ঘরে ঘুমায়েছিন নিতান্ত নিরাঁলা,__- কে পরালে মালা।

নৃতন-জাগা কুপ্তবনে কুহরি উঠে পিক, বসস্তের চুহ্ধনেতে বিবশ দশ দিক। বাতাস ঘরে প্রবেশ করে ব্যাকুল উচ্ছ্বাসে, নবীন ফুলম্ঞ্ররির গন্ধ লয়ে আসে। জাগিয়া উঠি বৈতালিক গাহিছে জয়গান, প্রাসাদদ্ধারে ললিত স্বরে বাশিতে উঠে তান শীতলছায় নদীর পথে কলসে লয়ে বারি-_ কাকন বাজে নৃপুর বাজে-_ চলিছে পুরনারী কাননপথে মর্ষরিয়া কাপিছে গাছপালা,

খখ

রবীন্দ্র-রচনাবলী

আধেক মুদি নয়ন ছুটি ভাবিছে রাজবাল1--_ কে পরালে মালা

বারেক মালা গলায় পরে, বারেক লহে খুলি, ছুইটি করে চাপিয়া ধরে বুকের কাছে তুলি শয়ন 'পরে মেলায়ে দিয়ে তৃষিত চেয়ে বয়, এমনি করে পাইবে যেন অধিক পরিচয় জগতে আজ কত না ধ্বনি উঠিছে কত ছলে, একটি আছে গোপন কথা, সে কেহ নাহি বলে। বাতাস শুধু কানের কাছে বহিয্ন যায় হুহু, কোকিল শুধু অবিশ্রাম ডাকিছে কুহু কুহু। নিভৃত ঘরে পরান-মন একাস্ত উতালা, শয়নশেষে নীরবে বসে ভাবিছে রাজবালা--- কে পরালে মালা

কেমন বীর-মুরতি তার মাধুরী দিয়ে মিশা

দীপ্তিভরা নয়নমাঝে তৃপ্তিহীন তৃষা

সোনার তরী ২৩

স্বপ্লে তারে দেখেছে যেন এমনি মনে লয়+--

ভুলিয়া গেছে, রয়েছে শুধু অসীম বিশ্ময়।

পারশে যেন বসিয়াছিল, ধরিয়াছিল কর,

এখনো তার পরশে যেন সরস কলেবর

চমকি মুখ ছ-হাতে ঢাকে, শরমে টুটে মন,

লঙ্জাহীন প্রদীপ কেন নিবেনি সেই ক্ষণ।

হতে ফেলিল হার ষেন বিজুলিজালা,

শয়ন "পরে লুটায়ে পড়ে ভাবিলরা জ্বালা -__

কে পরালে মালা।

এমনি ধীরে একটি করে কাটিছে দিনরাতি |

বসন্ত সে বিদায় নিল লইয়া যুখী-জাতি।

সঘন মেঘে বরষা আসে, বরষে ঝরঝর

কাননে ফুটে নবমালতী কদস্বকেশর

ত্বচ্ছ হাসি শরৎ আসে পুনিমা-মালিক1।

সকল বন আকুল করে শুভ্র শেফালিকা

রবীক্্র-রচনাঁবলী

আপিল শীত সঙ্গে লয়ে দীর্ঘ ছুথনিশ! | শিশির-ঝর কুন্দফ্ুলে হাসিয়! কাদে দিশ। | ফাগুন মাস আবার এল বহিয়া ফুলডালা জানালা-পাশে একেলা বসে ভাবিছে রাজবাঁলাঁ_ কে পরালে মালা।

শাস্তিনিকেতন ১৫ ট্যাষ্ঠ, ১২৯৯

তোমরা আমর

তোমর! হাপিয়। বহিয়া চলিয়!। যাও কুলুকুলুকল নর্দীর ন্রোতের মতো আমরা তীরেতে ফ্লাড়াযে চাহিয়! থাকি, মরমে গুমবি মরিছে কামনা কত। আপনা-আপনি কানাকানি কর স্থথে, কৌতুকছট। উছলিছে চোখে মুখে, কমল-চরণ পড়িছে ধরণীমাঝে, কনক-নৃপুর রিনিকি বিনিকি বাজে

অঙ্গে অঙ্গ বাধিছ বঙ্গপাশে,

বাহুতে বাহুতে জড়িত ললিত লতা, ইঙ্জিত-রসে ধ্বনিয়া উঠিছে হাসি,

নয়নে নয়নে বহিছে গোপন কথা

৩.....-০0৪

সোনার তরী ২৫

আখি নত করি একেল! গাঁথিছ ফুল, মুকুর লইয়া যতনে বাঁধিছ চুল

গোপন হৃদয়ে আপনি করিছ খেলা,

কী কথা ভাবিছ, কেমনে কাটিছে বেল!

চকিতে পলকে অলক উড়িয়া পড়ে, ঈষৎ হেলিয়! আচল মেলিয়! যাঁও-_ নিমেষ ফেলিতে আখি না মেলিতে, ত্বরা নয়নের আড়ে না জানি কাহারে চাও যৌবনরাশি টুটিতে লুটিতে চায়, বসনে শাসনে বাধিয়া রেখেছ তায় তবু শতবার শতধ] হইয়! ফুটে, চলিতে ফিরিতে ঝলকি চলকি উঠে

আমরা মূর্খ কহিতে জানিনে কথা,

কী কথা বলিতে কী কথা বলিয়া ফেলি। অসময়ে গিয়ে লয়ে আপনার মন,

পদতলে দিয়ে চেয়ে থাকি আখি মেলি তোমরা! দেখিয়া চুপি চুপি কথা কও, সথীতে সখীতে হাসিয়া অধীর হও, বসন-আচল বুকেতে টানিয়া লয়ে-- হেসে চলে যাও আশার অতীত হয়ে।

আমরা বৃহৎ অবোধ ঝড়ের মতো, আপন আবেগে ছুটিয়! চলিয়া আসি বিপুল আধারে অসীম আকাশ ছেয়ে টুটিবারে চাহি আপন হৃদয়বাশি |

২৬

১৬ জ্যষ্ঠ, ১২৯৯

রবীন্্-রচনাবলী

তোমব। বিজুলি হালিতে হাসিতে চাও, আধার ছেদিয় মরম বি ধিয়। দাও, গগনের গায়ে আগুনের বেখা আকি চকিত চরণে চলে যাঁও দিয়ে ফাকি

অযতনে বিধি গড়েছে মোদের দেহ,

নয়ন অধর দেয়নি ভাষায় ভবে, মোহন মধুর মন্ত্র জানিনে মোরা,

আপনা প্রকাশ করিব কেমন করে? তোমরা কোথায় আমবা কোথায় আছি, কোনে স্থলগনে হব না কি কাছাকাছি তোমরা! হাসিয়া বহিয়া চলিয়! যাবে, আমর! দ্রাড়ায়ে ৰহিব এমনি ভাবে!

কি

সোনার বাঁধন

বন্দী হয়ে আছ তুমি স্থমধুর স্েহে অয় গৃহলম্ষ্মী, এই করুণত্রন্দন এই ছুঃখদৈন্তে-ভবা! মানবের গেছে তাই ছুটি বাহু”পবে স্থন্দর-বন্ধন সোনার কঙ্কণ ছুটি বহিতেছ দেহে শুভচিহ্ু, নিখিলের নয়ন-নন্দন পুরুষের দুই বানু কিণাঙ্ক-কঠিন সার-সংগ্রামে সদ বন্ধনবিহীন ; যুদ্ধ-হুন্দ যত কিছু নিদারুণ কাজে বহ্ছিবাণ বজ্ঞসম সবত্র স্বাধীন

সোনার তরী

তুমি বন্ধ ন্েহ-গ্রেম-করুণার মাঝে, শুধু শুভকর্ম, শুধু সেবা নিশিদিন তোমার বাহুতে তাই কে দিয়াছে টানি, দুইটি সোনার গণ্ডি, কাকন দুখানি |

শান্তিনিকেতন ১৭ ট্যষ্ঠ, ১২৯৯

বর্ষা-যাপন রাজধানী কলিকাত। 7; তেতলার ছাতে কাঠের কুঠরি এক ধারে; আলে। আসে পূর্বদিকে প্রথম প্রভাতে বায়ু আসে দক্ষিণের দ্বারে |

মেঝেতে বিছানা পাতা, ছুয়ারে রাখিয়া মাথা, বাহিরে আখিরে দিই ছুটি,

মৌধ-ছাদ শত শত ঢাকিয়! রহস্য কত, আকাশেরে করিছে ভ্রকুটি |

নিকটে জানালা-গায় এক কোণে আলিসায় একটুকু সবুজের খেলা,

শিশু অশথের গাছ আপন ছায়ার নাঁচ সাবাদিন দেখিছে একেলা

দিগন্তের চারিপাশে আবাট নামিয়া আসে, বর্ষা আসে হইয়া! ঘোরালো,

সমস্ত আকাশজোড়া গরজে ইন্দ্রের ঘোড়া চিকমিকে বিছ্যতের আলো

চারিদিকে অবিবল ঝরুঝর বুষ্টিজল এই ছোটে! প্রাস্ত-ঘরটিবে

ন্২

রবীন্দ্র-রচনাবলী

দেয় নির্বাসিত করি, দশ দিক অপহরি, সমুদয় বিশ্বের বাহিরে

বসে বসে সঙ্গীহীন ভালো লাগে কিছুদিন পড়িবারে মেঘদূত-কথা ;--

বাহিরে দ্রিবস-রাতি বায়ু করে মাতামাতি বহিয়! বিফল ব্যাকুলতা ৮--

বনুপুর্ব আঁষাটের মেঘাচ্ছন্ন ভারতের নগ-নদী-নগরী বাহিয়া

কত শ্রুতিমধু নাম কত দেশ কত গ্রাম দেখে ষাই চাহিয়া চাহিয়া

ভালে! করে ক্রোহে চিনি, বিরহী বিরহিণী জগতের ছু-পারে ছু-জন,

প্রাণে প্রাণে পড়ে টান, মাঝে মহা ব্যবধান, মনে মনে কল্পনা হাজন।

যক্ষবধূ গৃহকোণে ফুল নিয়ে দিন গনে দেখে শুনে ফিরে আসি চলি।

বর্ষা আসে ঘন বোলে, যত্বে টেনে লই কোলে গোবিন্দদাসের পদাবলী

সুর করে বার বার পড়ি বর্ধাঅভিসার-_- অন্ধকার যমুনার তীর,

নিশীথে নবীনা বাধা নাহি মানে কোনো বাধা, খুজিতেছে নিকুগু-কুটির

অন্গক্ষণ দর দর বারি ঝরে ঝর ঝর, তাহে অতি দূরতর বন,

ঘরে ঘরে রুদ্ধ দ্বার, সঙ্গে কেহ নাহি আর

শুধু এক কিশোর মদন

আষাঢ় হতেছে শেষ, মিশায়ে মলার দেশ বচি “ভব বাদবের” জব | খুলিয়! প্রথম পাতা, গীতগোবিন্দের গাথা

গাহি “মেঘে অস্থর মেদুর ।”

সোনার তরী

স্তব্ধ রাত্রি দ্বিপ্রহরে ঝুপ ঝুপ বৃষ্টি পড়ে-_ শুয়ে শুয়ে সুখ-অনিদ্রায়

“রজনী শাঙন ঘন ঘন দেয়! গরজন” সেই গান মনে পড়ে যায়।

“পালক্ষে শয়ান বঙ্গে বিগলিত চীর অঙ্গে" মন-হ্খে নিদ্রায় মগন,--

সেই ছবি জাগে মনে পুরাতন বুন্দাবনে রাধিকার নির্জন স্বপন

মৃদু স্ব বহে শ্বাস, অধবে লাগিছে হাস কেঁপে উঠে মুদ্বিত পলক,-__

বাহুতে মাথাটি থুয়ে, একাকিনী আছে শুয়ে, গৃহকোণে ম্লান দীপালোক

গিরিশিরে মেঘ ডাকে, বৃষ্টি ঝরে তরুশাখে দ্রাতুরী ডাকিছে সারারাতি,-_

হেনকালে কী না ঘটে, সময়ে আসে বটে এক ঘরে স্বপনের সাথি

মরি মরি ন্বপ্নশেষে পুলকিত রসাবেশে যখন সে জাগিল একাকী,

দেখিল বিজন ঘরে দীপ নিবুনিবু করে প্রহরী প্রহর গেল হাকি ।--

বাড়িছে বুষ্টির বেগ, থেকে থেকে ডাকে মেঘ, বিল্লিবব পৃথিবী ব্যাপিয়া,

সেই ঘনঘোরা নিশি স্বপ্নে জাগরণে মিশি

না জানি কেমন করে হিয়।

লয়ে পুঁথি ছু-চাবিটি নেড়ে চেড়ে ইটি সিটি এইমতেো। কাটে দিনরাত তার পরে টানি লই বিদেশী কাব্যের বই

উলটি পালটি দেখি পাত 3+-

২৪১

৩৪

রবীন্দ্র-রচনাবলী

কোথা রে বর্ধার ছায়া, অন্ধকার মেঘমায়া, ঝরঝর ধরনি অহরহ, কোথায় সে কর্মহীন একান্তে আপনে-লীন জীবনের নিগুঢ বিরহ বর্ধার সমান স্থরে অন্তর বাহির পুরে ংগীতের মুষলধারায়, পরানের বদর কুলে কূলে ভরপুর,-- বিদেশী কাব্যে সে কোথা হায়। তখন সে পুঁথি ফেলি, দুয়ারে আসন মেলি বসি গিয়ে আপনার মনে, কিছু করিবার নাই চেয়ে চেয়ে ভাবি তাঁই দীর্ঘ দিন কাটিবে কেমনে মাথাটি করিয়া নিচু .বসে বসে রচি কিছু বহু যত্ধে সারাদিন ধরে, ইচ্ছা করে অবিরত আপনার মনোমত

গল্প লিখি একেকটি করে।

ছোটে প্রাণ, ছোটো ব্যথা, ছোটে ছোটে। হুঃখকথ! নিতাস্তই সহজ সবল,

সহম্্র বিস্বাতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি তারি দু-্চাবিটি অশ্রুজল |

নাহি বর্ণনার ছটা, ঘটনার ঘনঘটা নাহি তত্ব নাহি উপদেশ

অস্তরে অতৃপ্তি রবে সাঙ্গ করি মনে হবে শেষ হয়ে হইল না শেষ।

জগতের শত শত অসমাপ্ত কথ] যত, অকালেব বিচ্ছিন্ন মুকুল,

অজ্ঞাত জীবনগুলা, অখ্যাত কীতির ধুলা, কত ভাব, কত ভয় ভূল

সাবের দশদিশি ঝরিতেছে অহনিশি

ঝরঝর বরষার মতো

সোনার তরী ৩১

ক্ষণ-অশ্র ক্ষণ-হাসি পড়িতেছে রাশি রাশি, শব তার শুনি অবিরত।

সেই সব হেলাফেলা, নিমেষের লীলাখেলা! চারিদিকে করি শ্তপাকার,

তাই দিয়ে করি সৃষ্টি একটি বিশ্বৃতিবৃষ্টি জীবনের শ্রাবণনিশার

শেষ ১৭ জান) ১২৯৯ শান্তিনিকেতন আরম্ভ বহুদিনের

হিং টিং ছট্‌

বপ্রম্গল

স্বপ্ন দেখেছেন রাত্রে হবুচন্ত্র ভূপ,-_ অর্থ তার ভাবি ভাবি গবুটন্দর চুপ। শিয়রে বসিয়া যেন তিনটে বাদরে উকুন বাছিতেছিল পরম আদরে। একটু নড়িতে গেলে গালে মারে চড়, চোখে মুখে লাগে তার নখের আচড়। সহস। মিলাল তারা, এল এক বেদে, “পাখি উড়ে গেছে” ব'লে মরে কেদে কেদে; সম্মুখে রাজারে দেখি তুলে নিল ঘাড়ে, ঝুলায়ে বসায়ে দিল উচ্চ এক দাড়ে। নিচেতে প্লাড়ায়ে এক বুড়ি খুড়খুড়ি

. হাসিয়া পায়ের তলে দেয় স্ুড়নুড়ি। রাজা বলে, “কী আপদ।” কেহ নাহি ছাড়ে, পা দুটা তুলিতে চাহে, তুলিতে না পারে। পাখির মতন রাজ করে ছটফট,-- বেদে কানে কানে বলে-_-“হিং টিং ছট্‌।” স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃতসমান, গোৌড়ানন্দ কবি ভনে, শুনে পুণ্যবান।

৩২

রবীন্্র-রচনাবলী

হবুপুর রাজ আজ দিন ছয়-সাত . চোঁথে কারে! নিদ্রা নাই, পেটে নাই ভাত শীর্ণ গালে হাত দিয়ে নত করি শির রাজ্যস্ুদ্ধ বালবুদ্ধ ভেবেই অস্থির ছেলেরা ভূলেছে খেলা, পণ্ডিতেরা পাঠ, মেয়ের! করেছে চুপ--এতই বিভ্রাট সারি সারি বসে গেছে কথা নাহি মুখে, চিন্তা যত ভারি হয় মাথা পড়ে ঝুঁকে ভূঁইফোড়া তত্ব যেন ভূমিতলে খোজে, সবে যেন বসে গেছে নিরাকার ভোজে মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া উৎকট হঠাৎ ফুকাবি উঠে--“হিং টিং ছট্‌।” স্বপ্রম্জলের কথা অমৃতসমান , গৌড়ানন্দ কবি ভনে, শুনে পুণ্যবান।

চারিদিক হতে এল পণ্ডিতের দল,-_ অযোদ্ধা কনোজ কাঞ্ধী মগধ কোশল উজ্জয়িনী হতে এল বুধ-অবতংস-- কালিদাস কবীকন্দেব ভাগিন্য়বংশ | মোট মোট পুঁথি লয়ে উলটায় পাতা, ঘন ঘন নাড়ে বসি টিকিন্ুদ্ধ মাথা। বড়ো বড়ো মস্তকের পাকা শস্যখেত বাতাসে হুলিছে যেন শীর্ষ-সমেত।

কেহ শ্রুতি, কেহ স্থৃতি, কেহবা পুরাণ, কেহ ব্যাকরণ দেখে, কেহ অভিধান কোনোখানে নাহি পায় অর্থ কোনোরূপ, বেড়ে উঠে অনুম্থর-বিসর্গের স্তপ।

চুপ করে বসে থাকে বিষম সংকট, থেকে থেকে হেঁকে ওঠে--“হিং টিং ছট |”

সোনার তত্রী. ৩৩

স্বপ্নমঙ্গলের কথা অস্বতসমান, গোৌড়ানন্দ কবি ভনে, শুনে পুণ্যবান

কহিলেন হতাশ্বাস হবুচন্দ্ররাজ,

“ক্লেচ্ছদেশে আছে নাকি পণ্ডিত-সমাঁজ, তাহাদের ডেকে আনো যে যেধানে আছে-- অর্থ যদি ধরা পড়ে তাহাদের কাছে ।” কটাচুল নীলচক্ষু কপিশ-কপোল,

যবন পণ্ডিত আসে, বাজে ঢাকঢোল

গায়ে কালে মোট মোটা ছাটাছোটণ কুতি, গ্রীষ্মতাপে উদ্মা বাড়ে, ভাবি উগ্রমুতি ভূমিকা না করি কিছু ঘড়ি খুলি কয়-_ “সতেবে। মিনিট মাত্র রয়েছে সময়,

কথা ষদি থাকে কিছু বলো! চটপট |” সভান্থদ্ধ বলি উঠে-__ পহিৎ টিং ছট্‌ |” স্বপ্রমঙ্গলের কথ! অস্বতসমান,

গৌড়ানন্দ কবি ভনে, শুনে পুণ্যবান

স্বপ্ন শুনি শ্লেচ্ছমুখ রাড টকটকে,

আগুন ছুটিতে চাস মুখে আর চোখে হানিয়া দক্ষিণ মুষ্টি বাম করতলে

“ডেকে এনে পরিহাস” বেগেমেগে বলে ফরাসি পণ্ডিত ছিল, হাস্যোজ্জবলমুখে কহিল নোয়ায়ে মাথা, হস্ত রাখি বুকে, “ক্বপ্র যাহা শুনিলাম রাজযোগ্য বটে ; হেন ম্বপ্র সকলের অদৃষ্টে না ঘটে

কিন্তু তবু স্বপ্ন ওট1 করি অঙ্ছমান

যদিও রাজার শিরে পেয়েছিল স্থান

৩৪

রবীন্দ্-রচনাঁবলী

অর্থ চাই, রাজকোষে আছে ভূরি ভূরি, রাজন্বপ্রে অর্থ নাই, যত মাথা খুঁড়ি নাই অর্থ কিন্ত তবু কহি অকপট, শুনিতে কী মিষ্ট আহা, হিং টিং ছট্‌ 1৮ স্বপ্রম্জলের কথা অমুতসমান, গৌড়ানন্দ কবি ভনে, শুনে পুণ্যবাঁন

শুনিয়া সভাস্থ সবে করে ধিক ধিক--- কোথাকার গণ্মূর্থ পাষগু নাস্তিক স্বপ্ন শুধু স্বপ্রমাত্র মন্তিফ-বিকার, এ-কথা কেমন করে করিব হ্বীকার জগৎ্-বিখ্যাত মোবা প্ধর্মগ্রাণ” জাতি স্বপ্ন উড়াইয়! দিবে !-- ছুপুরে ডাকাতি ! হবুচজ্জ রাজ। কহে পাকালিয়। চোখ--- “গবুচন্দ্র, এদের উচিত শিক্ষা হোক হেটোয় কণ্টক দাও, উপরে কণ্টক, ডালকুতাঁদের মাঝে করহু বণ্টক |” সতেবো মিনিট কাল না! হইতে শেষ, শ্নেচ্ছ পণ্ডিতের আর না মিলে উদ্দেশ সভাস্থ সবাই ভাসে আনন্দাশ্নীরে, ধর্মরাজ্যে পুনর্বার শাস্তি এল ফিরে পণ্তিতের! মুখ চক্ষু করিয়া বিকট পুনর্বার উচ্চারিল-_ “হিং টিং ছট্‌ 1” ত্বপ্রমজলের কথা অম্বৃতসমান, গৌড়ানন্দ কবি ভনে, শুনে পুণাবান।

অতঃপর গৌড় হতে এল হেন বেলা যবন পণ্ডিতদের গুরুমারা চেলা

সোনার তরী ৩৫

নগ্রশির, সঙ্জা নাই, লজ্জা নাই ধড়ে-_- কাছা-কৌোচ1 শতবার খসে খসে পড়ে অস্তিত্ব আছে না আছে, ক্ষীণ খবদেহ, বাক্য যবে বাহিরায় না থাকে সন্দেহ। এতটুকু যন্ত্র হতে এত শব্দ হয়

দেখি! বিশ্বের লাগে বিষম বিস্ময়

না জানে অভিবাদন, না পুছে কুশল, পিতৃনাম শুধাইলে উদ্যত মুঘল

সগর্বে জিজ্ঞাসা করে, “কী লয়ে বিচার, শুনিলে বলিতে পাবি কথ! দুই-চার, ব্যাখ্যায় করিতে পারি উলট-পালট |” সমম্বরে কহে সবে-- হিৎ টিং ছট্‌ 1৮ স্বপ্রমঙ্গলের কথা অস্বতসমান, গৌড়ানন্দ কবি ভনে, শুনে পুণ্যবান

স্বপ্রকথা শুনি মুখ গভীর করিয়া কহিল গৌড়ীয় সাধু প্রহর ধরিয়া, “নিতান্ত সরল অর্থ, অতি পরিফার, বহু পুরাতন ভাব, নব আবিষ্কার ত্র্য্বকের ত্রিনয়ন ভ্রিকাল ভ্তিগুণ শক্তিভেদে ব্যক্তিভেদ দ্বিগুণ বিগুণ বিবত্তন আবণ্তন সন্বর্তন আদি জীবশক্তি শিবশক্তি করে বিসম্বাদী আকর্ষণ বিকর্ষণ পুরুষ প্রকৃতি আণব চৌন্বকবলে আকুতি বিকৃতি কুশাগ্রে প্রবহমান জীবাত্মবিছ্যুৎ ধারণা পরমা শক্তি সেথায় উদ্ভূত ত্রয়ী শক্কি তিত্বরূপে প্রপঞ্চে প্রকট-.৮ ₹ক্ষেপে বলিতে গেলে, হিং টিং ছট্‌ |”

রবীন্দ্র-রচনীবলী

স্বপ্রমলের কথ! অম্তসমান, গৌড়ানন্দ কবি ভনে, শুনে পুণ্যবান

সাধু সাধু সাধু” রবে কাপে চারিধার, সবে বলে-- পরিফার, অতি পরিষ্ণার। ছুর্বোধ ষা-কিছু ছিল হয়ে গেল জল, শূন্য আকাশের মতো অত্যন্ত নির্মল ছাপ ছাড়ি উঠিলেন হবুচন্দ্রাজ, আপনার মাথা হতে খুলি লয়ে তাজ পরাইয়া দিল ক্ষীণ বাঙালির শিরে,_ ভাবে তার মাথাটুকু পড়ে বুঝি ছি'ড়ে। বহুদ্দিন পরে আজ চিন্ত। গেল ছুটে, হাবুডুবু হবু-রাজ্য নড়িচড়ি উঠে। ছেলেরা ধৰিল খেলা, বুদ্ধেরা তামুক, এক দণ্ডে খুলে গেল রমণীর মুখ দেশজোড়? মাথাধরা ছেড়ে গেল চট্‌, সবাই বুঝিয়া গেল-_ হিং টিং ছট্‌। স্বপ্লমঙ্গলের কথা অস্ুৃতসমান, গৌড়ানন্দ কবি ভনে, শুনে পুণাবান।

যে শুনিবে এই স্বপ্নমঙ্গলের কথা,

সর্বভ্রম ঘুচে ষাবে নহিবে অন্যথা

বিশ্বে কভূ বিশ্ব ভেবে হবে না ঠকিতে, সত্যেরে সে মিথ্যা বলি” বুবিবে চকিতে যা আছে তা নাই, আর, নাই যাহা আছে, এ-কথা৷ জাজল্যমান হবে তার কাছে সবাই সরলভাবে দেখিবে যা-কিছু,

সে আপন লেজুড় জুড়িবে তার পিছু

সোনার তরী ৩৭

এস ভাই, তোলো হাই, শুয়ে পড়ো চিত, অনিশ্চিত সংসারে একথা! নিশ্চিত-_ জগতে কলি মিথা। সব মায়াময়,

স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়। স্বপ্রমঙ্গলের কথা অস্তসমান।

গৌড়ানন্ম কবি ভনে, শুনে পুণ্যবান।

শান্তিনিকেতন ১৮ জ্যোষ্ঠ, ১২৯৯

প্রশ-পাথর

খ্যাপ! খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশ-পাথর।

মাথায় বৃহৎ জটা ধুলায় কাদায় কটা,

মলিন ছায়ার মতো ক্ষীণ কলেবর।

ওষ্ঠে অধরেতে চাপি অন্তরের দ্বার ঝাপি রাত্রিদিন তীব্র জালা জেলে রাখে চোখে।

দুটো নেত্র সদা যেন নিশার খঘ্যোত-হেন উড়ে উড়ে খোঁজে কারে নিজের আলোকে

নাহি যার চালচুলা গায়ে মাথে ছাইধুলা কটিতে জড়ানো৷ শুধু ধূসর কৌপীন,

ডেকে কথা কয় তাবে কেহ নাই সংসারে, পথের ভিখারি হতে আরে দীনহীন,

তার এত অভিমান, সোনারুপা৷ তুচ্ছজ্ঞান, রাজসম্পদের লাগি নহে সে কাতর,

দশ! দেখে হাসি পায় আর কিছু নাহি চায় একেবারে পেতে চায় পরশ-পাথর।

সম্মুখে গরজে সিন্ধু অগাধ অপার তরঙ্গে তরঙ্গ উঠি হেসে হল কুটিকুটি

৩৮

রবীন্দ্র-রচনাবলী

স্থপ্টিছাঁড়। পাগলের দেখিয়। ব্যাপার

আকাশ রয়েছে চাহি, নয়নে নিমেষ নাহি, হুছু ক'রে সমীরণ ছুটেছে অবাধ

স্রর্ধ ওঠে প্রাতঃকালে পূর্ব-গগনের ভালে, সন্ধযাবেলা ধীবে ধীরে উঠে আসে টাদ।

জলরাশি অবিরল করিতেছে কলকল, অতল রহস্ত যেন চাহে বলিবারে

কাম্য ধন আছে কোথা জানে যেন সব কথা,

. সে-ভাষা যে বোঝে সেই খুঁজে নিতে পাবে। কিছুতে ভ্রক্ষেপ নাহি, মহাগাথা গান গাহি

সমুদ্র আপনি শুনে আপনার স্বর কেহ যায়, কেহ আসে, কেহ কাদে, কেহ হাসে, খ্যাপ। তীরে খুঁজে ফিরে পরশ-পাথর

এক দিন, বহুপূর্বে আছে ইতিহাস-_

নিকষে সোনার বেখা সবে যেন দিল দেখা-_ আকাশে প্রথম স্যষ্টি পাইল প্রকাশ।

মিলি যত সুরান্থর কৌতৃহলে ভরপুর এসেছিল পা টিপিয়া এই সিন্ধুতীরে।

অতলের পানে চাহি নয়নে নিমেষ নাহি নীরবে দাড়ায়ে ছিল স্থির নতশিরে।

বহুকাল স্তব্ধ থাকি শ্তুনেছিল মুদে আখি এই মহাসমুদ্রের গীতি চিরস্তন;

তার পরে কৌতুহলে ঝাপায়ে অগাধ জলে করেছিল অনন্ত রহস্য মন্থন

বহুকাল ছুঃখ সেৰি নিরখিল, লক্ষ্মীদেবী উদ্দিলা জগৎমাঝে অতুল সুন্দর

সেই সমুদ্রের তীরে শীর্ণদেহে জীর্ণচীবে খ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশ-পাথর

সোনার তরী

এতদিনে বুঝি তার ঘুচে গেছে আশ

খুঁজে খুঁজে.ফিরে তবু বিশ্রাম না জানে কভু, আশা গেছে, যায় নাই খোজার অভ্যাস

বিরহী বিহঙ্গ ডাকে সারাদিন তরুশাখে, যারে ভাকে তার দেখা পায় না অভাগা!

তবু ডাকে সারাদিন আশাহীন শ্রাস্তিহীন, একমাত্র কাজ তার ডেকে ডেকে জাগা

আর-সব কাজ ভুলি আকাঁশে তরঙ্গ তুলি সমুদ্র না জানি কারে চাহে অবিরত

যত করে হায় হায় কোনোকালে নাহি পায়, তবু শৃন্তে তোলে বাহু, ওই তার ব্রত

কারে চাহি ব্যোমতলে গ্রহতারা লয়ে চলে, অনস্ত সাধনা করে বিশ্বচরাচর |

সেইমতো সিম্ধুতটে ধূলিমাঁথা দীর্ঘজটে খ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশ-পাথর

একদা শুধাল তারে গ্রামবাপী ছেলে, “সন্্যাসীঠাকুর, কী, কাকালে কী দেখি, সোনার শিকল তুমি কোথা হতে পেলে ।”

সন্ন্যাসী চমকি ওঠে, শিকল সোনার বটে, লোহ। সে হয়েছে সোনা জানে না কখন।

একি কাণ্ড চমৎকার, তুলে দেখে বার বার আখি কচালিয়! দেখে, নহে শ্বপন।

কপালে হানিয়া কর বসে পড়ে ভূমি'পর, নিজেরে করিতে চাহে নির্দয় লাঞ্ছনা,

পাগলের মতো চায়-- কোথা গেল, হায় হায়, ধর! দিয়ে পলাইল সফল বাঞ্ছনা

কেবল অভ্যাসমত চুড়ি কুড়াইত কত,

ঠন করে ঠেকাইত শিকলের »পর,

৩৪৯

রবীন্দ্র-রচনাবলী

চেয়ে দেখিত না, নুড়ি দুরে ফেলে দিত ছু'ড়ি, কখন ফেলেছে ছুড়ে পরশ-পাথর।

তখন যেতেছে অস্তে মলিন তপন আকাশ সোনার বর্ণ, সমুন্র গলিত স্বর্ণ, পশ্চিম-দিথধূ দেখে সোনার স্বপন সন্গযাসী আবার ধীরে পূর্বপথে যায় ফিরে খুঁজিতে নৃতন ক'রে হারানো রতন সে-শকতি নাহি আর নুয়ে পড়ে দেহভার অস্তর লুটাঁয় ছিন্ন তরুর মতন পুরাতন দীর্ঘপথ পড়ে আছে ম্বৃতবৎ হেথা হতে কত দূর নাহি তার শেষ। দিক হতে দিগন্তরে মরুবালি ধুধু করে, আসন্ন রজনী-ছায়ে শ্লান সবদেশ। অর্ধেক জীবন খুঁজি কোন্‌ ক্ষণে চক্ষু বুজি স্পর্শ লভেছিল যার এক পলভর, বাকি অর্ধ ভগ্ন প্রাণ আবার করিছে দান ফিরিয়া খুঁজিতে সেই পরশ-পাথর শাস্তিনিকেতন ১৯ জ্যৈষ্ট, ১২৯৯

বৈষব-কবিতা

শুধু বৈকুণ্ঠের তরে বৈষুবের গান? পৃবরাগ অনুরাগ, মান-অভিমান, অভিসার, প্রেমলীলা, বিরহ-মিলন, বৃন্দাবন-গাথা,-_ এই প্রণয়-স্বপন শ্রীবণের শর্বরীতে কালিন্দীর কুলে, চারি চক্ষে চেয়ে দেখা কদম্বের মূলে

৩.৬

মোনার তরী ৪১

শরমে সন্ত্রমে-- কি শুধু দেবতার সংগীত-রসধান্বা নহে মিটাবার ঈীন মণ্্যবাসী এই নরনারীদের প্রতিরজনীর আর গ্রতিদ্দিবসের তগ্ প্রেমতৃষা ?

গীত-উতৎসব মাঝে শুধু তিনি আর ভক্ত নির্জনে বিরাজে ; াড়ায়ে বাহির-ছারে মোর] নরনারী উৎস্থক শ্রবণ পাতি শুনি যদি তারি ছুয়েকটি তান,_দূর হতে তাই শুনে তরুণ বসস্তে যদি নবীন ফাস্তুনে অস্তর পুলকি উঠে? শুনি সেই স্থুর সহসা দেখিতে পাই দ্বিগুণ মধুর আমাদের ধরা ;-_মধুময় হয়ে উঠে আমাদের বনচ্ছায়ে যে-নদীটি ছুটে, মোদের কুটির-প্রাস্তে ষে-কদন্ব ফুটে বরষার দিনে সেই প্রেমাতুর তানে যদি ফিরে চেয়ে দেখি, মোর পার্পানে ধরি” মোর বাম বাহু রয়েছে ছাড়ায়ে ধরার সঙ্গিনী মোর হৃদয় বাড়ায়ে মোর দিকে, বহি নিজ মৌন ভালোবাস! ওই গানে যদ্দি বা সে পায় নিজ ভাষা,-- যদি তার মুখে ফুটে পূর্ণ প্রেমজ্যোতি। তোমার কি তার, বন্ধু, তাঁহে কার ক্ষতি

সত্য করে কহ মোরে হে বৈষ্ণব কবি, কোথা তুমি পেয়েছিলে এই প্রেমছবি, কোথা তুমি শিখেছিলে এই গ্রেমগান বিরহ-তাপিত | হেরি কাহার নয়ান,

৪২

রবীন্দ্র-রচনাবলী

রাধিকার অশ্র-আথি পড়েছিল মনে বিজন ব্সস্তরাতে মিলন-শয়নে কে তোমারে বেঁধেছিল ছুটি বাহুভোরে, আপনার হৃদয়ের অগাধ সাগরে রেখেছিল মগ্ন করি। এত প্রেমকথা, রাধিকার চিত্রদীর্ণ তীব্র ব্যাকুলতা চুরি করি লইয়াছ কার মুখ, কার আখি হতে আজ তার নাহি অধিকার সে সংগীতে ? তারি নারী-হৃদয়-সঞ্চিত তার ভাষা হতে তারে করিবে বঞ্চিত চিরদিন?

আমাদেরি কুটির-কাননে ফুটে পুষ্প, কেহ দেয় দেবতা-চরণে, কেহ রাখে প্রিয়জন তরে-_- তাহে তার নাহি অসস্তোষ। এই প্রেম্গীতি-হার গাথা হয় নরনারী-মিলনমেলায়, কেহ দেয় তারে, কেহ বধুর গলায় দেবতারে যাহা দিতে পারি, দিই তাই প্রিয়জনে-_প্রিয়জনে যাহ! দিতে পাই তাই দিই দেবতারে ; আর পাব কোথা। দেবতারে প্রিয় কৰি, প্রিয়েরে দেবত]।

বৈষ্ণব কবির গাথা প্রেষ-উপহাঁর চলিয়াছে নিশির্দিন কত ভারে ভার বৈকুষ্ঠের পথে মধ্যপথে নরনারী অক্ষয় সে স্থধারাশি করি কাড়াকাড়ি লইতেছে আপনার প্রিয়গৃহতরে যথাসাধ্য যে যাহার ; যুগে যুগাস্তরে চিরদিন পৃথিবীতে যুবকযুবতী নরনারী এমনি চঞ্চল-মতিগতি।

সোনার তরী ৪৩

ছুই পক্ষে মিলে একেবাবে আত্মহার! অবোধ অজ্ঞান। সৌন্দর্যের দস্থ্য তার! লুটেপুটে নিতে চায় সব। এত গীতি, এত ছন্দ, এতভাবে উচ্ছ্বসিত গ্রীতি, এত মধুরত৷ দ্বারের সম্মুখ দিয়া

বহে যায়-_ তাই তারা পড়েছে আসিয়া সবে মিলি কলরবে সেই স্থধাস্রোতে সমুদ্রবাহিনী সেই প্রেমধারা হতে

কলস ভরিয়! তার! লয়ে ধায় তীরে বিচার না করি কিছু, আপন কুটিরে আপনার তরে। তুমি মিছে ধর দোষ, হে সাধু পণ্ডিত, মিছে করিতেছ রোষ ধার ধন তিনি ওই অপার সন্তোষে অনীম স্নেহের হাসি হাসিছেন বসে।

শাহাজাদপুর ১৮ আধা, ১২৭৯৭

ঢুই পাখি

খাঁচার পাখি ছিল সোনার খাচাটিতে বনের পাখি ছিল বনে।

একদ1। কী করিয়া মিলন হল দোহে, কী ছিল বিধাতার মনে।

বনের পাখি বলে-_ খাঁচার পাখি ভাই, বনেতে যাই দোহে মিলে

খাচার পাখি বলে-_- বনের পাখি, আয় থাচায় থাকি নিরিবিলে বনের পাখি বলে-_ না

আমি শিকলে ধর! নাহি দিব।

88

রবীক্র-রচনাবলগী

খাচার পাখি বলে-হায়, আমি কেমনে বনে বাহিবিব

বনের পাখি গাছে বাহিরে বসি বসি বনের গান ছিল ফত।

খাঁচার পাখি পড়ে শিখানো বুলি তার, র্োহার ভাষা! দুই মতো

বনের পাখি বলে-_ খাঁচার পাখি ভাই, বনের গান গাও দিখি

খাচার পাখি বলে-- বনের পাঁখি ভাই, খাচার গান লহ শিখি। বনের পাখি বলে-- না,

আমি শিখানো গান নাহি চাই, খাচার পাখি বলে-- হায়,

আমি কেমনে বন-গান গাই

বনের পাখি বলে-- আকাশ ঘননীল, কোথাও ধাধা নাহি তার।

খাঁচার পাখি বলে-- খাচাটি পরিপাটি ফেমনচাক1 চারিধার

বনের পাখি বলে-- আপনা ছাড়ি.দাও মেঘের মাঝে একেবারে

খাঁচার পাখি বলে নিরালা হুখকোণে বাঁধিয়া বাখো আপনারে বনের পাখি বলে-- না,

সেথা কোথায় উড়িবারে পাই থাচার পাখি বলে” হায়,

মেঘে কোথায় বসিবার ঠাই।

শাহাজাদপুর ১৯ আধাট, ১২৯৯

সোনার তরী | ৪৫

এমনি ছুই পাখি হারে ভালোবাসে তবুও কাছে নাহি পায়।

খাঁচার ফাকে ফাকে পরশে মুখে মুখে, নীরবে চোখে চোখে চায়।

দুজনে কেহ কারে বুঝিতে নাহি পাবে, বুঝাতে নারে আপনায়

দুজনে একা একা ঝাপটি মরে পাখা কাতবে কহে--- কাছে আয়। বনের পাখি বলে-- না,

কবে খাচায় রুধি দিবে দ্বার | থাঁচার পাখি বলে-- হায়,

মোর শকতি নাহি উড়িবার

আকাশের চাদ

হাতে তুলে দাও আকাশের ঠাদ-- এই হল তার বুলি।

দিবস রজনী যেতেছে বহিয়া, কাদে সে দু-হাত তুলি।

হাসিছে আকাশ, বহিছে বাতাস, পাখির! গাহিছে স্থখে।

সকালে রাখাল চলিয়াছে মাঠে, বিকালে ঘরের মুখে।

বালক-বালিকা ভাইবোনে মিলে

খেলিছে আডিনা-কোণে,

কোলের শিগুবে হেবিয় জননী

হাসিছে আপন মনে

রবীন্্র-রচনাবলী

কেহ হাটে যায় কেহ বাটে যায় চলেছে যে যার কাজে, কত জনরব কত কলরব উঠিছে আকাশমাঝে। পথিকের এসে তাহারে শুধায়, “কে তুমি কাদিছ বসি ।” সে কেবল বলে নয়নের জলে, “হাতে পাই নাই শশী ।”

সকালে বিকালে ঝরি পড়ে কোলে অযাচিত ফুলদল,

দখিন সমীর বুলায় ললাটে দক্ষিণ করতল।

প্রভাতের আলো আশিস-পরশ করিছে তাহার দেহে,

রজনী তাহারে বুকের আচলে ঢাকিছে নীরব ন্সেহে।

কাছে আলি শিশু মাগিছে আদর কণ্ঠ জড়ায়ে ধরি,

পাশে আসি যুব চাহিছে তাহারে লইতে বন্ধু করি।

এই পথে গৃহে কত আনাগোনা, কত ভালোবাসাবাসি,

সংসার-স্থথ কাছে কাছে তার কত আসে যায় ভাসি,

মুখ ফিরাইয়! সে রৃহে বসিয়া, কহে সে নয়নজলে,

“তোমাদের আমি চাহি না কারেও,

শী চাই করতলে।”

সোনার তরী ৪৭ শশী যেথা ছিল সেখাই রহিল,

সেও বসে এক ঠীাই। অবশেষে যবে জীবনের দিন আর বেশি বাকি লাই, এমন সময়ে সহসা কী ভাবি চাহিল সে মুখ ফিরে, দেখিল ধরণী শ্যামল মধুর, সুনীল সিন্ধৃতীরে। সোনার ক্ষেত্রে কষাণ বসিয়া